ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী গত সোমবার আকস্মিকভাবে দিল্লি সফর শুরু করেছেন। প্রায় তিন দিনের এই সফরে তিনি অত্যন্ত ব্যস্ত সময় পার করছেন বলে বিভিন্ন কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে। মঙ্গলবার তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে একান্তে বৈঠক করেছেন। দায়িত্ব গ্রহণের পর গত পাঁচ মাসের মধ্যে মোদির সঙ্গে এটি তার দ্বিতীয় বৈঠক। ভারতীয় কূটনীতিকদের মধ্যে একজন রাজনীতিবিদ হিসেবে দীনেশ ত্রিবেদীকে বিশেষ কেবিনেট মন্ত্রীর মর্যাদা দিয়ে ঢাকায় পাঠানো হয়, যাতে তিনি সরাসরি ভারতের প্রধানমন্ত্রীর কাছে বাংলাদেশ সংক্রান্ত বিষয়ে রিপোর্ট করতে পারেন। অভিজ্ঞ এই রাজনীতিককে নিয়োগের বিষয়টি নিয়ে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি অংশের আপত্তি থাকলেও, দুই দেশের সম্পর্ক ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের দ্রুত বাস্তবায়নে মোদির সঙ্গে তার সরাসরি যোগাযোগকে ভারত সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে। তবে আচমকাই তিনি সোমবার ঢাকা থেকে নয়াদিল্লি এসেছেন। সাধারণত ক্যারিয়ার কূটনীতিকদের ক্ষেত্রে এ ধরনের সরাসরি যোগাযোগের কোনো সুযোগ থাকে না।
কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই সফরে বাংলাদেশের বর্তমান নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সম্ভাব্য ভারত থেকে ফেরার বিষয়টি আলোচনার মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। একই দিনে ভারতীয় সেনাপ্রধান জেনারেল ধীরাজ শেঠের সঙ্গে ত্রিবেদীর বৈঠকটিকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে বিবেচনা করা হচ্ছে। ভারতীয় সেনাবাহিনীর ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে এক পোস্টে জানানো হয়, বৈঠকে দুই প্রতিবেশী দেশের প্রতিরক্ষা অংশীদারিত্ব ও কৌশলগত সামরিক সমন্বয় জোরদারের উপায় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। এছাড়া পারস্পরিক সহযোগিতার ক্ষেত্রগুলোকে আরও সুদৃঢ় করার জন্য বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নেওয়ার ওপরও জোর দেওয়া হয়েছে। সেই মোতাবেক ত্রিবেদী বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের বর্তমান অবস্থা এবং তা কীভাবে এগিয়ে নেয়া যায় তা নিয়ে মোদির সঙ্গে আলোচনা করেছেন। এক্ষেত্রে সহযোগিতার ক্ষেত্রগুলো পর্যালোচনা করার পাশাপাশি তা আরও সুদৃঢ় করার জন্য বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নেয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন তারা।
ভারতের সেনাপ্রধানের সঙ্গে এই বৈঠকে দ্বিপক্ষীয় সামরিক বোঝাপড়া, অভিন্ন নিরাপত্তা স্বার্থ এবং যৌথ সহযোগিতার বিভিন্ন দিক তুলে ধরেছেন হাই কমিশনার। ধারণা করা হচ্ছে, দিল্লিতে অবস্থানকালে তিনি ভারতের বিভিন্ন নিরাপত্তা সংস্থার কর্মকর্তাদের সঙ্গেও গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক করবেন এবং সবশেষে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের সঙ্গে আলোচনা করবেন। অনেকের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে নিষিদ্ধঘোষিত রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের সঙ্গে সমঝোতার বিষয়ে যে আলোচনা চলছে, সেখানেও দীনেশ ত্রিবেদীর বিশেষ ভূমিকা থাকতে পারে। ঢাকার বিভিন্ন পর্যায় থেকে হাসিনার প্রত্যাবর্তন বিষয়ে তিনি যে ধারণা পেয়েছেন, সেটিই তিনি এখন দিল্লিতে ভারতীয় নীতিনির্ধারকদের কাছে পৌঁছে দিচ্ছেন বলে মনে করা হচ্ছে। দিল্লিতে কূটনৈতিক মহলেও ত্রিবেদীর দিল্লি ছুটে আসা এবং একের পর এক বৈঠকের মাধ্যমে কী বার্তা পৌঁছে দিতে চাইছেন তা নিয়ে আলোচনা চলছে।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশে নিযুক্ত হওয়ার পর থেকেই ত্রিবেদী সরকারের মন্ত্রী ও উপদেষ্টাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রেখে আসছেন। গত এক সপ্তাহে তিনি দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক উন্নয়ন ও শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ ইস্যুতে ভারতের অবস্থান নিয়ে একাধিকবার বক্তব্য রেখেছেন। এদিকে, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আসন্ন ভারত সফরকে সামনে রেখে বর্তমানে দুই দেশের মধ্যে বিভিন্ন স্তরে ওয়ার্কিং গ্রুপের বৈঠক শুরু হয়েছে। দুই দেশের মধ্যে প্রায় ৯০টি ওয়ার্কিং গ্রুপ কার্যকর রয়েছে, যার ধারাবাহিকতায় বাণিজ্যসহ গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন বিষয়ে আগামী ৮ ও ৯ অক্টোবর দিল্লিতে একটি প্রতিনিধিদল বৈঠক করবেন বলে জানা গেছে।