ভারতের উত্তর প্রদেশ, মহারাষ্ট্র, কর্ণাটক ও বিহার—এই চার রাজ্যের বিধান পরিষদ নির্বাচনের ফলাফল বিজেপি ও কংগ্রেস উভয় দলের জন্যই উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নির্বাচনী আসন বারানসি এবং রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘের (আরএসএস) সদর দপ্তর নাগপুরের মতো গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে বিজেপির পরাজয় দলটির অস্বস্তি বাড়িয়েছে। অন্যদিকে, কংগ্রেসের জন্য পরিস্থিতি আরও হতাশাজনক; কারণ ২৮টি আসনের মধ্যে তারা নাগপুর ছাড়া আর কোথাও জয়ী হতে পারেনি। বিশেষ করে কর্ণাটকে, যেখানে দলটি বর্তমানে ক্ষমতায় রয়েছে, সেখানে ৪টি আসনের প্রতিটিতেই তারা পরাজিত হয়েছে। ওই রাজ্যে ৪ আসনের প্রতিটিতেই তারা হেরেছে। গতকাল বুধবার এই ফল প্রকাশের পরেই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি কংগ্রেসকে তীব্র কটাক্ষ করে সমাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, ‘চার বড় রাজ্য উত্তর প্রদেশ, মহারাষ্ট্র, বিহার ও কর্ণাটকে বিধান পরিষদের ২৮ আসনে ভোট হলো। কংগ্রেস ‘ভোট চুরি’র জন্য নির্বাচন কমিশনের পাশাপাশি দায়ী করে আসছে ইভিএমকেও। তিন মাসের মধ্যে যে রাজ্যে বিধানসভার ভোট, সেখানে বারানসির মতো আসনে ২ বিধান পরিষদে এসপির কাছে হার এবং এসপির আসন বৃদ্ধি রাজনৈতিক দিক থেকে তাৎপর্যপূর্ণ। এর চেয়েও বড় কথা, বারানসির যে দুই কেন্দ্রে ভোট হয়, শিক্ষক সমাজ ও স্নাতকেরা ছিলেন সেখানকার ভোটার। উত্তর প্রদেশে ভোট হয় ১১ আসনে। মোট আসনের ১২ ভাগের এক ভাগের নির্বাচকমণ্ডলী হলেন শিক্ষক সমাজ ও স্নাতকেরা। মোট আসনের ৬ ভাগের এক ভাগকে মনোনীত করেন রাজ্যপাল। বিধান পরিষদের মোট আসনের এক–তৃতীয়াংশ নির্বাচন করেন বিধায়ক ও পৌরসভা-পঞ্চায়েতের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা। ভারতীয় সংসদে যেমন দুটি কক্ষ, লোকসভা ও রাজ্যসভা; তেমনই ভারতের রাজ্যগুলোর নিম্নকক্ষ হলো বিধানসভা, উচ্চকক্ষ বিধান পরিষদ। তবে পশ্চিমবঙ্গ, কেরলমসহ অধিকাংশ রাজ্যেই বিধান পরিষদ তুলে দেওয়া হয়েছে। এই আসনটি ২০২০ সালেও কংগ্রেস জিতেছিল। বিহারে ভোট হয় ৮ আসনে। এই ভোটে বোঝা গেল, বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রী সিদ্দারামাইয়ার সঙ্গে রাজনৈতিক সংঘাত না মিটলে কংগ্রেসকে এই রাজ্য হতাশ করতে পারে।
নির্বাচনী ফলাফলের প্রতিক্রিয়ায় বুধবার প্রধানমন্ত্রী মোদি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কংগ্রেসকে তীব্র আক্রমণ করেন। ব্যালট পেপারে হওয়া এই নির্বাচনের ফলাফলের দিকে ইঙ্গিত করে তিনি জানতে চান, কংগ্রেস কয়টি আসন জিতেছে। এর শেষে তিনি একটি আতশি কাচের ইমোজি যুক্ত করেন। উল্লেখ্য যে, ইভিএমের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে কংগ্রেস নিয়মিত প্রশ্ন তুলে ব্যালট পেপারে ভোটের দাবি জানিয়ে আসছিল, যার পরিপ্রেক্ষিতে মোদি এই কটাক্ষ করেন। ওই মন্তব্যের শেষে মোদি চোখে আতশি কাচ ধরা একটা ইমোজি জুড়ে দেন। কটাক্ষের একটা কারণ হার; অন্য কারণ, ইভিএমের সমালোচনা।
তবে মোদির এই মন্তব্যের সময় নাগপুরের ফলাফল ঘোষণা হয়নি। পরে দেখা যায়, মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফাডনবিশের নির্বাচনী আসন এবং সংঘের ঘাঁটি নাগপুরে কংগ্রেস প্রার্থী অভিজিৎ ওয়াংজারি ৩ হাজার ২৭১ ভোটে জয়ী হয়েছেন। এই পরাজয়ের পর কংগ্রেস মুখপাত্র পবন খেরা পাল্টা জবাবে বলেন, মোদি নিজের লোকসভা এলাকা এবং নাগপুরের মতো গুরুত্বপূর্ণ আসনগুলোতে বিজেপিকে হারের মুখে ঠেলে দিয়েছেন। ঘর ও দল গোছানোর সময় মুখ্যমন্ত্রী শিবকুমার পাবেন।
উত্তর প্রদেশে ১১টি আসনের মধ্যে বিজেপি জিতেছে ৬টি, আর সমাজবাদী পার্টি (এসপি) জিতেছে ৫টি।
সমাজবাদী পার্টি আগেরবারের চেয়ে দুটি বেশি আসন পাওয়ায় রাজনৈতিকভাবে তারা শক্তিশালী অবস্থানে আছে। বিশেষ করে বারানসির মতো জায়গায় শিক্ষক ও স্নাতক ভোটারদের বিজেপি থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া বেশ তাৎপর্যপূর্ণ বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। এছাড়া মহারাষ্ট্রের পাঁচটি আসনের মধ্যে বিজেপির নেতৃত্বাধীন ‘মহাজুটি’ পেয়েছে মাত্র দুটি, আর বাকি তিনটি পেয়েছে বিরোধী ‘এমভিএ’ জোট। প্রসঙ্গত, নাগপুর আসনটি আগে থেকেই কংগ্রেসের দখলে ছিল এবং এর আগে টানা ২৪ বছর এই এলাকা থেকে বিধান পরিষদের সদস্য ছিলেন নিতিন গড়করি। কিন্তু এবার তা ছিনিয়ে নিতে সেখানকার বাসিন্দা ও সেখান থেকে বিধানসভায় নির্বাচিত মুখ্যমন্ত্রী ফাডনবিশ এবং সেখানকার সংসদ সদস্য নিতিন গড়করি চেষ্টার ত্রুটি রাখেননি। বিজেপি সভাপতি নীতিন নবীনের বিধানসভা আসন বাঁকিপুরের উপনির্বাচনে জয়ের পর জনসুরাজ পার্টি এবার বিধান পরিষদেও চলে এল।
কংগ্রেসের জন্য কর্ণাটকের ফলাফল ছিল সবচেয়ে বড় ধাক্কা। ডি কে শিবকুমারের নেতৃত্বাধীন সরকারে থাকা সত্ত্বেও সেখানে কংগ্রেস তাদের আগের জেতা আসনটিও ধরে রাখতে পারেনি। বিজেপির শরিক দল জেডি(এস) সেই আসন ছিনিয়ে নিয়েছে, আর বিজেপি তাদের আগের তিনটি আসনই ধরে রেখেছে। ২০২৮ সালে রাজ্য বিধানসভার ভোটের আগে এই ফলাফল কংগ্রেসের জন্য অভ্যন্তরীণ সংকট মোকাবিলার তাগিদ দিচ্ছে। মুখ্যমন্ত্রিত্ব পাওয়ার পর ডি কে শিবকুমারের এটাই ছিল প্রথম ভোট।
অন্যদিকে বিহারে প্রশান্ত কিশোরের নেতৃত্বাধীন জনসুরাজ পার্টি নির্বাচনে নতুন সাফল্যের দেখা পেয়েছে। তারা দ্বারভাঙার শিক্ষক আসনটিতে কংগ্রেসকে ৩২৪ ভোটে পরাজিত করেছে। বিহারে হওয়া ৮টি আসনের মধ্যে বিজেপি ৩টি, জেডি(ইউ) ১টি, আরজেডি ১টি, জনসুরাজ পার্টি ১টি এবং বাকি ২টি স্বতন্ত্র প্রার্থীরা জিতেছেন। বিধান পরিষদ নির্বাচনে শিক্ষক ও স্নাতক ভোটারদের ভোটদানের এই প্রক্রিয়া ভারতীয় রাজনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়।