প্রযুক্তির ক্রমবিকাশের সাথে সাথে মানুষের তৈরি কন্টেন্ট ও সত্যের পার্থক্য করা দিন দিন কঠিন হয়ে উঠছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই এখন এমন এক উচ্চতায় পৌঁছেছে, যেখানে নিখুঁত ডিপফেক ছবি, ভিডিও এবং অডিও তৈরি করা খুবই সহজ। বর্তমানে এই প্রযুক্তি শুধু পর্নোগ্রাফি বা প্রতারণাই নয়, বরং বিশ্বজুড়ে রাজনৈতিক পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করার মতো গুরুতর সংকট তৈরি করছে। সাম্প্রতিক এক প্রামাণ্যচিত্রে ডিপফেকের উত্থান ও এর ভয়াবহ পরিণতির চিত্র ফুটে উঠেছে।
ডিজিটাল জালিয়াতির ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, ১৯৮৭ সালে ফটোশপ সফটওয়্যারের মাধ্যমে এর সূচনা হয়েছিল। কম্পিউটারবিজ্ঞানী জন নোল তাঁর বন্ধু জেনিফারের ছবি সম্পাদনা করে বিশ্বের প্রথম ডিজিটাল ক্লোন তৈরি করেছিলেন। ডেস্কটপ কম্পিউটারের সহজলভ্যতায় সাধারণ মানুষ ছবি বিকৃত করার সুযোগ পায়। শুরুর দিকে তারকাদের সম্পাদিত ছবি ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়ার প্রবণতা দেখা দিত, যা শনাক্ত করতে এড লেক নামক ব্যক্তি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। তিনি ছবির আলোর কারুকাজ বা কানের দুলের কোণ পর্যবেক্ষণ করে ভুয়া ছবি শনাক্ত করার চেষ্টা করতেন।
২০১৪ সালে সফটওয়্যার প্রকৌশলী ইয়ান গুডফেলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জগতে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনেন। বন্ধুদের সাথে আড্ডার সময় তিনি জেনারেটিভ অ্যাডভার্সারিয়াল নেটওয়ার্ক বা ‘গ্যান’ ধারণাটি উদ্ভাবন করেন। এই পদ্ধতিতে দুটি এআই নেটওয়ার্ক একে অপরের বিরুদ্ধে কাজ করে—একটি ছবি তৈরি করে এবং অন্যটি তাতে ভুল খুঁজে বের করে। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সময়ের সাথে সাথে অত্যন্ত উচ্চ রেজোলিউশনের এবং বাস্তবসম্মত ছবি তৈরি করা সম্ভব হয়েছে।
চিকিৎসাবিজ্ঞান বা বিজ্ঞানের উন্নয়নের লক্ষ্য থাকলেও এই প্রযুক্তি দ্রুত অপরাধের হাতিয়ার হয়ে ওঠে। প্রযুক্তি সাংবাদিক সামান্থা কোল জানান, অল্প সময়ের ব্যবধানে মানুষের মুখ অন্য কারও শরীরে বসানোর কৌশল সহজতর হয়। রেডিটের এক ব্যবহারকারী ইয়ান গুডফেলোর কাজকে অনুসরণ করে এই ভিডিও প্রযুক্তি আরও এগিয়ে নেন। এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাধারণ প্রম্পট বা টুইট ব্যবহার করেই আপত্তিকর ডিপফেক কনটেন্ট তৈরি করা যাচ্ছে।
এআই প্রযুক্তির এই অপপ্রয়োগের শিকার হয়ে ব্যক্তিগত জীবনে ভয়াবহ পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছেন সাংবাদিক ও গায়িকা জুলি ইউকুরি। তাঁর একটি সাধারণ ছবি ব্যবহার করে গ্রোক এআইয়ের মাধ্যমে আপত্তিকর কনটেন্ট তৈরি করা হয়েছিল, যা তাঁর ওপর গভীর মানসিক প্রভাব ফেলে। নিউ ইয়র্ক টাইমসের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মাত্র নয় দিনে গ্রোক এআই প্রায় ১৮ লাখ যৌনতাপূর্ণ ছবি তৈরি করেছে। বর্তমানে বিশ্বে ডিপফেক নির্ভর প্রতারণার বাজার প্রায় ২০০ কোটি ডলারের সমপরিমাণ বলে ধারণা করা হয়।
রাজনীতির ময়দানে ডিপফেক এখন বড় উদ্বেগের কারণ। ২০২২ সালে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির একটি ভুয়া ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়া হয়, যেখানে তাঁকে আত্মসমর্পণের আহ্বান জানাতে দেখা যায়। যদিও সেই ভিডিওটি সহজেই শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছিল। একইভাবে ২০২৪ সালে ভারতে বলিউড তারকাদের ব্যবহার করে রাজনৈতিক প্রচারণার ভুয়া ভিডিও ছড়ানো হয় এবং মার্কিন নির্বাচনেও একই ধরনের জালিয়াতির ঘটনা ঘটে।
এই ক্রমবর্ধমান ঝুঁকি মোকাবিলায় বিশ্বজুড়ে সরকারগুলো কঠোর হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশ অন্তরঙ্গ ডিপফেক কনটেন্ট তৈরি ও প্রচার নিষিদ্ধ করেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন কন্টেন্ট লেবেলিং বাধ্যতামূলক করেছে। ইলন মাস্কের মতো উদ্যোক্তারাও সমালোচনার মুখে পড়ে এখন এক্স প্ল্যাটফর্মে ডিপফেক সংক্রান্ত বিষয়ে কড়াকড়ি আরোপ করতে বাধ্য হয়েছেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: পরবর্তী সময়ে ২০১৪ সালে সফটওয়্যার প্রকৌশলী ইয়ান গুডফেলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জগতে বিপ্লব ঘটান। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: সম্প্রতি বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিসের একটি প্রামাণ্যচিত্রে ডিপফেক প্রযুক্তির উত্থান ও এর নেতিবাচক প্রভাব বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: পর্নোগ্রাফির গণ্ডি পেরিয়ে ডিপফেক এখন বিশ্বরাজনীতির জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: যদিও বড় মাথা এবং নিচু কণ্ঠস্বর দেখে সেটি যে ভুয়া তা সহজেই বোঝা গিয়েছিল। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: বিভিন্ন দেশের সরকার এই জালিয়াতি রোধে কঠোর আইন প্রণয়ন করছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ইউরোপীয় ইউনিয়নের আইনে এই ধরনের কনটেন্ট স্পষ্টভাবে লেবেল করার নিয়ম রাখা হয়েছে।