ড্রোন হামলার ক্রমবর্ধমান হুমকি মোকাবিলায় পাকিস্তানের পুলিশ এক ব্যতিক্রমী ও ব্যয়সাশ্রয়ী উপায় অবলম্বন করেছে। খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশের ঝুঁকিপূর্ণ চেকপোস্টগুলোর সুরক্ষা নিশ্চিত করতে বর্তমানে সেখানে মাছ ধরার জাল টাঙানো হচ্ছে। পুলিশ কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, বিস্ফোরক বহনকারী ড্রোনগুলো এ ধরনের জালে আটকে যেতে পারে। এছাড়া ড্রোন যদি জালের ওপর বিস্ফোরিতও হয়, তবে বিস্ফোরকের ধাতব টুকরাগুলো নিচে থাকা সদস্যদের ওপর সরাসরি আঘাত হানার পরিবর্তে ছড়িয়ে পড়বে, যা ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ অনেক কমিয়ে আনবে।
এই উদ্যোগটি মূলত গত ১৬ এপ্রিল হাঙ্গু জেলার সারকি পিয়ালা পুলিশ চেকপোস্টে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ হামলার প্রেক্ষাপটে নেওয়া হয়েছে। ওইদিন পুলিশ কর্মকর্তা ফাইয়াজ খান ও তার সহকর্মীরা বিস্ফোরকবাহী ড্রোন এবং এরপর সশস্ত্র হামলাকারীদের গুলির মুখে পড়েন। তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি) হামলার দায় স্বীকার করে। সাত ঘণ্টার দীর্ঘ সংঘর্ষে সাঁজোয়া গাড়ির চালক নিহত এবং একজন কনস্টেবল আহত হয়েছিলেন। ফাইয়াজ খান জানান, সেই ভয়াবহ অভিজ্ঞতার পর তারা চেকপোস্টের চারপাশে জাল টাঙানোর সিদ্ধান্ত নেন। গত দুই মাসে সেখানে নতুন করে কোনো ড্রোন হামলা হয়নি। বিস্ফোরকবাহী ড্রোন হামলার পর চারদিক থেকে গুলি চালায় হামলাকারীরা। এনিয়ে ফাইয়াজ খান বলেন, ‘আমরা তখন যুদ্ধের মাঝখানে ছিলাম। বেঁচে বাড়ি ফিরতে পারব কিনা, সেটিও জানতাম না। এরপরই চেকপোস্টের ছাদ ও সীমানাপ্রাচীরের মাঝে কয়েক মিটার উঁচুতে মাছ ধরার জাল টাঙানোর উদ্যোগ নেয় পুলিশ। হামলাকারীরা এখন গুলিবর্ষণ ও মর্টারের পাশাপাশি ড্রোন ও কোয়াডকপ্টারও ব্যবহার করছে। পরে কয়েক ঘণ্টার সংঘর্ষে ১৫ হামলাকারীও নিহত হয়।
একটি সাধারণ চেকপোস্টে এই সুরক্ষা ব্যবস্থা স্থাপন করতে প্রায় ৪ লাখ পাকিস্তানি রুপি বা ১ হাজার ৪৩৫ ডলার খরচ হয়। হাঙ্গু জেলা পুলিশের কর্মকর্তা তারিক হাবিব জানিয়েছেন, ড্রোন ও কোয়াডকপ্টারের ক্ষয়ক্ষতি কমানোর উদ্দেশ্যে জেলার অন্যান্য স্টেশন ও চেকপোস্টেও এই মডেল প্রয়োগ করা হচ্ছে। খাইবার পাখতুনখোয়া পুলিশের মুখপাত্র আবদুস সালাম খালিদ জানান, কোহাট, কারাক, বান্নু, লাক্কি মারওয়াত ও ডেরা ইসমাইল খানসহ অন্তত পাঁচটি জেলায় এই অ্যান্টি-ড্রোন জাল বসানো হয়েছে। এছাড়া কিছু সামরিক চৌকিতেও এই ব্যবস্থা অনুসরণ করা হচ্ছে। এতে সেটিকে থামানো বা নিষ্ক্রিয় করা সম্ভব।
পাকিস্তানে সাম্প্রতিক সময়ে পুলিশ ও সামরিক বাহিনীর ওপর ড্রোন ও কোয়াডকপ্টার হামলার হার বেড়েছে। চলতি বছর হাঙ্গুতে অন্তত ১৬টি হামলার ঘটনা ঘটেছে। ২৯ জুলাই এক কোয়াডকপ্টার হামলায় ১১ জন পুলিশ সদস্য নিহত এবং ২৮ জন আহত হয়েছিলেন, যার দায় নিয়েছিল টিটিপি। তবে জাল ব্যবহারের এই কৌশলের কার্যকারিতা নিয়ে নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। পেশোয়ারের বিশ্লেষক ফিদা আদিল মনে করেন, ড্রোন শনাক্ত ও প্রতিহত করার উন্নত প্রযুক্তির বিকল্প হিসেবে জাল ব্যবহারের ধারণাটি নিরাপত্তার একটি মিথ্যা অনুভূতি তৈরি করতে পারে। গত ২৯ জুলাই বোমাবাহী কোয়াডকপ্টার দিয়ে একটি পুলিশ চৌকিতে হামলার পর স্থলপথে হামলা চালানো হয়।
তিনি আরও বলেন, পুলিশের দাবি করা ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ ক্ষয়ক্ষতি কমানোর এই হিসাব বাস্তব পরীক্ষার মাধ্যমে যাচাই করা জরুরি। ইউক্রেনে রুশ ড্রোন প্রতিরোধেও একই কৌশল ব্যবহৃত হয়েছিল উল্লেখ করে তিনি বলেন, এটি পুরোপুরি সুরক্ষা নিশ্চিত করবে না। এ বিষয়ে পুলিশ কর্মকর্তা ফাইয়াজ খান জানান, তারা এই জালের মাধ্যমে শতভাগ নিরাপত্তার দাবি করছেন না, তবে এটি হামলাকালীন ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা কমাতে কিছুটা হলেও সহায়ক হবে বলে তারা মনে করছেন। কোহাটে পরীক্ষামূলকভাবে জালের ওপর বিস্ফোরক ফেলে তা সফলভাবে প্রতিহত করার দাবি করেছে পুলিশ কর্তৃপক্ষ।