রবিবার, ০৮ নভেম্বর ২০২৬, ০৯:৫৬ অপরাহ্ন
শিরোনাম :
চক্ষুস্বাস্থ্য সুরক্ষায় শুধু চিকিৎসা নয়, দরকার সমন্বিত সচেতনতা: স্বাস্থ্যমন্ত্রী ট্রাম্প-এরদোগান ফোনালাপ: ইরান উত্তেজনা ও ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধের উদ্যোগ নিয়ে আলোচনা ইরানের পরমাণু স্থাপনায় ট্রাম্পের সামরিক অভিযানের গুঞ্জন: বর্তমান পরিস্থিতি ট্রাম্পবাদ কি মার্কিন রাজনীতির বিভাজন ঘুচিয়ে পারবে যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক আরোপ ও বাংলাদেশের বাণিজ্যের বর্তমান পরিস্থিতি বিচার বিভাগের বেশি ক্ষতি করেছে বুদ্ধিবৃত্তিক দুর্নীতি: আইনমন্ত্রী অর্থনীতি গণতান্ত্রিক না হলে রাজনীতির গণতন্ত্র কার্যকর হয় না: অর্থমন্ত্রী বিগত সরকারের জিডিপি হিসাবে গরমিল, জানালেন অর্থমন্ত্রী নির্বাচনের ফল বানচালের চেষ্টায় আদালতের দ্বারস্থ নেতানিয়াহুর দল ভৈরব নদের ভাঙনে বিলীন লোহাপট্টির অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার লড়াই

তরুণ প্রজন্মের বিদেশমুখী হওয়ার নেপথ্যে যেসব কারণ

প্রতিবেদকের নাম

স্নাতক শেষ হওয়ার মানেই কি সবকিছুর সমাপ্তি? নাকি জীবনের নতুন কোনো লড়াইয়ের শুরু? সকালে ক্লাস, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা আর পরিবারের সান্নিধ্যে কাটানো দিনগুলো শেষ বর্ষের পর হঠাৎ করেই বদলে যায়। ইন্টারভিউ, সিভি ড্রপ আর ক্যারিয়ার গড়ার চিন্তায় যখন শিক্ষার্থীরা বুঁদ হয়ে থাকে, তখন তাদের বড় একটি অংশের ভাবনায় যোগ হয় নতুন একটি গন্তব্য—বিদেশ। বর্তমান সময়ে জেন-জি বা নতুন প্রজন্মের মধ্যে বিদেশ যাওয়ার প্রবণতা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। স্নাতকের শেষ, কিন্তু এই শেষ মানেই কি সত্যি শেষ। সকালে ক্লাস, এর ফাঁকে আড্ডা, দুপুরে বাড়ি এসে মায়ের হাতের রান্না খেয়ে আরামের এক ভাতঘুম। এর সঙ্গে আবার যুক্ত হয়েছে নতুন চিন্তা—বিদেশ যেতে হবে। এ পথেই একটু হলেও আশার আলো দেখতে পান শিক্ষার্থীরা। স্নাতকোত্তর যখন ছুঁই ছুঁই, তখন মাথায় যেন শুধুই ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তা। আইইএলটিএস, এসওপি, ব্যাংক স্টেটমেন্ট, স্পনসরের কাগজ—কাজের যেন শেষ নেই।

পরিসংখ্যান বলছে, গত এক দশকে বিদেশে উচ্চশিক্ষায় যাওয়া বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা দ্বিগুণের বেশি হয়েছে। ইউনেসকোর তথ্য অনুযায়ী, ২০১৩ সালে এই সংখ্যাটি ছিল ২৪ হাজারের কিছু বেশি, যা ২০২৩ সালে প্রায় ৫২ হাজার ৮০০ জনে দাঁড়িয়েছে। কেবল উচ্চশিক্ষাই নয়, ক্যারিয়ার ও জীবনের নিরাপত্তার খোঁজে তরুণরা এখন দেশ ছাড়াকেই শ্রেয় মনে করছেন। বর্তমানে অবস্থান করছেন কানাডার সেন্ট জন শহরে।

উচ্চশিক্ষার শুরুর ধাপে অর্থাৎ এইচএসসির পরপরই বিদেশে যাওয়ার এমন সিদ্ধান্তের অন্যতম কারণ দেশে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তি হওয়ার অসুস্থ প্রতিযোগিতা। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রতি আসনের বিপরীতে গড়ে প্রায় ৩৬ জন শিক্ষার্থীকে লড়াই করতে হয়। এই কঠিন ভর্তিযুদ্ধ থেকে বাঁচতে অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী শুরুতেই বিদেশকে বেছে নেন। কানাডায় অবস্থানরত তাসমিম বিনতে করিম অমি উচ্চমাধ্যমিক শেষ করেই দেশ ছেড়েছিলেন ভর্তিযুদ্ধের চ্যালেঞ্জ এড়াতে। স্নাতক–পরবর্তী বিদেশযাত্রা নিয়ে কথা বলার আগে বলতে হয় উচ্চশিক্ষার প্রথম ধাপেই যাঁরা এমন সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন, তাঁদের নিয়ে। ভর্তিযুদ্ধ নামক চ্যালেঞ্জে হেরে যাওয়ার ভয়টা ছিল ব্যাপক। এত ঝামেলার পরেও বিদেশই কেন প্রথম পছন্দ। তবে শুধু উন্নত মানের শিক্ষাই নয়, চাকরির অনিশ্চয়তাও তরুণদের দেশ ছাড়ার বড় কারণ। এই যদি হয় চাকরির বাজার, তবে বিদেশ ছুটে যাওয়াই শ্রেয় নয়কি।

স্নাতক শেষে অধিকাংশ তরুণ তিনটি পথের কোনো একটি বেছে নিতে বাধ্য হন—বিসিএস, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি অথবা বিদেশে পাড়ি জমানো। প্রথম দুটি ক্ষেত্রে বিপুল প্রতিযোগিতার মুখে অনেকেই আশাহত হন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি এবং পুলিশ সায়েন্স বিভাগের শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী জান্নাতুল ফেরদৌস তৃপ্তি জানান, উন্নত মানের শিক্ষার সুযোগ এবং সীমিত আসনের কারণেই শিক্ষার্থীরা ইউরোপ বা আমেরিকার মতো দেশগুলোতে যেতে আগ্রহী। ভালো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের নিয়োগ পরীক্ষা; তিন। ফলে বুঝতেই পারছেন, না চাইলেও ভালো সুযোগের জন্য ইউরোপ, আমেরিকার মতো দেশগুলোকে অগ্রাধিকার দিতেই হচ্ছে।’। যার মূলে তাঁরা চাকরি এবং ভবিষ্যতের নিশ্চয়তাকে রাখছেন। পরিবার থেকে দূরে আছেন এই দীর্ঘ সময়জুড়ে।

চাকরির বাজারের ভয়াবহ চিত্রও এই বিদেশমুখী হওয়ার পেছনে বড় ভূমিকা রাখছে।

বিবিএস শ্রমশক্তি জরিপ ২০২৪ অনুযায়ী, ২০২৩ সালে দেশে বেকারের সংখ্যা ছিল প্রায় ২৪ লাখ ৬০ হাজার, যা ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে ২৬ লাখ ২০ হাজারে উন্নীত হয়েছে। আইএমএফের ফিন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ম্যাগাজিনের তথ্যমতে, ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সী শিক্ষিত তরুণ শ্রমশক্তির প্রায় ৩৬ শতাংশই বেকার। এমন পরিস্থিতির কারণে বিদেশকে জেন-জিরা অনেক বেশি নিরাপদ ও নিশ্চিত মনে করছেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে শিক্ষার্থীরা বিদেশে পড়াশোনার জন্য ৬৬ কোটি ডলারেরও বেশি পাঠিয়েছেন।

নারী শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে বিদেশযাত্রার আগ্রহ আরও বেশি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ব্যক্তিস্বাধীনতা, সামাজিক নিরাপত্তা এবং আত্মনির্ভরশীল হওয়ার আকঙ্ক্ষা এর মূল কারণ। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, ছেলেদের তুলনায় মেয়েরা উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে যাওয়ার বিষয়ে অধিকতর আগ্রহী। জার্মানির এক জরিপে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে ২৫ শতাংশ ছাত্রী বিদেশে উচ্চশিক্ষার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন, যেখানে ছাত্রদের ক্ষেত্রে এই হার ২০ শতাংশ। এ ধরনের প্রতিযোগিতা দেশে থেকে ভবিষ্যৎ গড়ার ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিরূপ মনোভাব সৃষ্টি করছে।

অবশ্য বিদেশ মানেই যে সব পাওয়া, তা নয়। প্রবাস জীবনেও রয়েছে নানা চ্যালেঞ্জ। তাসমিমের মতে, বিদেশের মাটিতে নিজেকে মানিয়ে নেওয়া এবং একা যেকোনো পরিস্থিতি সামলানোর ধকল অনেক বড়। তবুও উন্নত জীবনব্যবস্থা ও ক্যারিয়ারের নিশ্চয়তার আশায় তরুণরা এসব চ্যালেঞ্জ নিতে দ্বিধা করছেন না। রামরুর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে প্রায় ১১ লাখ ৩০ হাজার ৭৫৭ জন কর্মী বিদেশে গেছেন। এর মধ্যে উচ্চশিক্ষার পাশাপাশি একটি বড় অংশ কাজের সন্ধানে জীবনের ঝুঁকি নিতেও দ্বিধা করে না।

কানাডায় ২০২৬ সালে শিক্ষার্থীর আসন সংখ্যা ১ লাখ ৫৫ হাজারে সীমাবদ্ধ রাখা এবং যুক্তরাষ্ট্রে খরচ বেড়ে যাওয়ার কারণে তরুণরা এখন জার্মানি, ইতালি, ফিনল্যান্ড, দক্ষিণ কোরিয়া ও চীনের মতো দেশগুলোর দিকে ঝুঁকছেন। জাপানের সাগা বিশ্ববিদ্যালয়ে এ বছর ৫১ জন বাংলাদেশি শিক্ষার্থী ভর্তি হয়েছেন, যা ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বিদেশি শিক্ষার্থী দল। গন্তব্য বদলালেও স্বপ্নের কেন্দ্রবিন্দুতে কোনো পরিবর্তন আসেনি। তবে বিদেশমুখী এই স্রোতের মধ্যেও অনেকে দেশে ফিরে এসে অবদান রাখার স্বপ্ন দেখেন, যা নতুন প্রজন্মের ইতিবাচক মানসিকতার পরিচয় বহন করে। তবে যে কারণে দেশ ছাড়তে চেয়েছিলেন, তাতে অনেকটাই সফল হয়েছেন।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


আমাদের ফেসবুক পেইজ