রবিবার, ০৮ নভেম্বর ২০২৬, ০৯:৪৯ অপরাহ্ন
শিরোনাম :
চক্ষুস্বাস্থ্য সুরক্ষায় শুধু চিকিৎসা নয়, দরকার সমন্বিত সচেতনতা: স্বাস্থ্যমন্ত্রী ট্রাম্প-এরদোগান ফোনালাপ: ইরান উত্তেজনা ও ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধের উদ্যোগ নিয়ে আলোচনা ইরানের পরমাণু স্থাপনায় ট্রাম্পের সামরিক অভিযানের গুঞ্জন: বর্তমান পরিস্থিতি ট্রাম্পবাদ কি মার্কিন রাজনীতির বিভাজন ঘুচিয়ে পারবে যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক আরোপ ও বাংলাদেশের বাণিজ্যের বর্তমান পরিস্থিতি বিচার বিভাগের বেশি ক্ষতি করেছে বুদ্ধিবৃত্তিক দুর্নীতি: আইনমন্ত্রী অর্থনীতি গণতান্ত্রিক না হলে রাজনীতির গণতন্ত্র কার্যকর হয় না: অর্থমন্ত্রী বিগত সরকারের জিডিপি হিসাবে গরমিল, জানালেন অর্থমন্ত্রী নির্বাচনের ফল বানচালের চেষ্টায় আদালতের দ্বারস্থ নেতানিয়াহুর দল ভৈরব নদের ভাঙনে বিলীন লোহাপট্টির অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার লড়াই

ট্রাম্পবাদ কি মার্কিন রাজনীতির বিভাজন ঘুচিয়ে পারবে

প্রতিবেদকের নাম

টেক্সাসে ডেমোক্রেটিক পার্টির হয়ে প্রায় ৪০ বছর পর সিনেট আসনে জয়লাভের পর নবনির্বাচিত সিনেটর জেমস ট্যালারিকো মার্কিন রাজনীতি নিয়ে এক নতুন বার্তা দিয়েছেন। তিনি মনে করেন, জনগণ একে অপরের বিরুদ্ধে চলমান বিষোদ্গার ও ঘৃণার রাজনীতি সহ্য করতে করতে ক্লান্ত। তাঁর মতে, গত ১০ বছর ধরে দেশটিতে যে ধরনের রক্তক্ষয়ী ও অপমানজনক রাজনীতির চর্চা চলছে, তা পরিবার এবং বন্ধুত্বের সম্পর্কে ফাটল ধরাচ্ছে। সম্প্রতি প্রায় ৪০ বছর পর টেক্সাসে ডেমোক্রেটিক পার্টির হয়ে প্রথম মার্কিন সিনেট সিটে জয়লাভের পর নবনির্বাচিত সিনেটর জেমস ট্যালারিকো বলেন, ‘আমার মনে হয় এটা নিশ্চিত যে আমরা একে অপরের বিরুদ্ধে লাগাতার বিষোদ্‌গার সহ্য করতে করতে ক্লান্ত। আমি ট্যালারিকো বা তাঁর নীতিগুলোকে পছন্দ করি না। শ্রেণি–রাজনীতির হাতুড়িতে যেভাবে চুরমার হচ্ছে ট্রাম্পবাদ। তাঁর পুনরুত্থানকে নিয়তি বলেই মনে হচ্ছিল। কিন্তু রাজনীতির হাওয়া প্রায়ই যেভাবে বদলায়, ভোটারদের মেজাজও পাল্টে গেল। তবে এটি কেবল যুদ্ধের কারণে নয়—ভোটাররা আসলে এই পুরো নাটকীয়তাতেই ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন। কারণ, জনগণ এই বাজে বকানি থেকে মুক্তি পেয়ে পরিবর্তনের ছোঁয়া চেয়েছিলেন।

প্রায় এক দশক ধরে ডোনাল্ড ট্রাম্পের হাত ধরে মার্কিন রাজনীতিতে এক নতুন ধারার সূচনা হয়েছে। প্রতিপক্ষকে হেয় করার জন্য ধারালো ও অপমানজনক ডাকনাম ব্যবহারের মাধ্যমে তিনি রাজনৈতিক অঙ্গনে এক ধরনের পেশাদার কুস্তির পরিবেশ তৈরি করেছিলেন। ট্রাম্পের অনুগত ‘মাগা’ সমর্থকেরা এই শৈলীকে পছন্দ করতেন, কারণ এর মাধ্যমেই তাঁরা অভিজাত শ্রেণির বিরুদ্ধে তাঁদের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটাতেন। এগুলো যেন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দ্বারা তৈরি নয় কিংবা দামি বক্তৃতা লেখকদের লেখা নয়।

বারাক ওবামা অনেক আগেই সতর্ক করেছিলেন যে, হতাশা থেকে মানুষ বন্দুক, ধর্ম এবং বিদ্বেষের আশ্রয় নিতে পারে। ট্রাম্প ঠিক এই সুযোগটিই কাজে লাগিয়েছিলেন। তিনি অবৈধ অভিবাসন এবং মুক্তবাণিজ্য নীতি নিয়ে সরাসরি কথা বলে ভোটারদের কাছে এক স্বচ্ছ ও স্ক্রিপ্টহীন নেতা হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন করতে সক্ষম হয়েছিলেন। ট্রাম্পের ভাষা সাধারণ মানুষের কাছে বাস্তব ও খাঁটি বলে মনে হতো, যা তাকে জনপ্রিয়তার শীর্ষে নিয়ে যায়। যেমন ‘ক্রুকেড হিলারি’, ‘লো-এনার্জি জেব’, ‘পোকাহন্টাস’, ‘লিটল মার্কো’, ‘ক্রেজি বার্নি’, ‘লাইং টেড’। ট্রাম্প আনুষ্ঠানিকভাবে হোয়াইট হাউসের দৌড়ে যোগ দেওয়ার সাত বছর আগে সান ফ্রান্সিসকোতে এক ভাষণে বারাক ওবামা বলেছিলেন যে এ ধরনের মানুষেরা ‘হতাশ হয়ে পড়েন, তাই তাঁরা তাঁদের হতাশা দূর করতে বন্দুক, ধর্ম, অন্যদের প্রতি বিদ্বেষ, কিংবা অভিবাসী ও বাণিজ্যবিরোধী মনোভাব। মধ্যবর্তী নির্বাচনেই কি শেষ হবে ট্রাম্প-যুগ।

২০২০ সালের নির্বাচনের পর ট্রাম্প যখন ফল মেনে নিতে অস্বীকার করেছিলেন, তখন তিনি আইনি কৌশলের পাশাপাশি ক্যাপিটল হিলে সমর্থকদের জড়ো করার চেষ্টা চালিয়েছিলেন। যদিও সেই সময় তিনি ক্ষমতা হারান, তবুও তিনি রাজনীতি থেকে পুরোপুরি বিদায় নেননি। জো বাইডেনের চার বছরের মেয়াদে ট্রাম্প নানাবিধ আইনি সংকট, কারাদণ্ডের হুমকি ও হত্যাচেষ্টা মোকাবিলা করে ২০২৪ সালে পুনরায় ক্ষমতায় আসার মতো শক্ত অবস্থানে ফিরে এসেছিলেন। এ যেন একেবারে নিম্নস্তরের এক সংঘাতের খেলা।

তবে ২০২৪ সালের নির্বাচনে ভোটারদের মেজাজ পুরোপুরি বদলে গিয়েছিল।

ট্রাম্পের সেই পুরোনো অসংলগ্ন স্টাইল এখন আর ভোটারদের টানছে না।

তারা এখন মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার মান নিয়ে সুনির্দিষ্ট সমাধান ও প্রতিশ্রুতি পূরণের হিসাব চাইতে শুরু করেছেন।

ট্রাম্প বিদেশের যুদ্ধে না জড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিলেও ইরানের বিষয়টি নিয়ে ভোটারদের কাছে কোনো গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা দিতে পারেননি, যা তাদের মোহভঙ্গের অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

নির্বাচনী বিশ্লেষকদের মতে, এই নির্বাচন শুধু কোনো রাজনৈতিক দলের জয়-পরাজয় ছিল না; বরং এটি ছিল ট্রাম্পের ব্যক্তিগত রাজনৈতিক সংস্কৃতির বিরুদ্ধে একটি গণভোট। নারী, হিস্পানিক, এশিয়ান, আরব এবং আফ্রিকান–আমেরিকানসহ বিভিন্ন শ্রেণি ও বর্ণের ভোটাররা ট্রাম্পের ভাষার প্রতি বিরক্ত ছিলেন। এর ফলে ট্রাম্পের গড়ে তোলা বিশাল মাগা জোট এক রাতের নির্বাচনে পুরোপুরি ভেঙে পড়ে। এটি পরিবারগুলোকে ভেঙে দিচ্ছে, বন্ধুত্ব ধ্বংস করছে এবং সব সময় আমাদের সবাইকে এক বিশ্রী অনুভূতিতে ডুবিয়ে রাখছে।’। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর এই আক্রমণগুলো দারুণ সাড়া ফেলেছিল এবং এটি এমন এক মার্কিন সংস্কৃতিকে ফুটিয়ে তুলেছিল, যা তৎকালীন রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতি মোটেও শ্রদ্ধাশীল ছিল না; বরং তাঁরা অনেক বেশি অশালীন ভাষা এবং বিনোদনে বেশি আগ্রহী ছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রে টি পার্টি আন্দোলনের সময় বিক্ষোভরত ক্রুদ্ধ ভোটারদের ট্রাম্প একছাতার নিচে আনেন এবং ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ (মাগা) গড়ে তোলেন। এটি কাজ করেনি, কিন্তু এর ফলে রাজনীতি থেকে তাঁর বিদায়ও ঘটেনি। ট্রাম্প নারী, হিস্পানিক, এশিয়ান, আরব, আফ্রিকান–আমেরিকানদের নিজের থেকে দূরে ঠেলে দিয়েছিলেন এবং মধ্য পশ্চিমের সুশিক্ষিত নাগরিকদের ব্যথিত করেছিলেন।

রিপাবলিকান দলের জন্য এবারের ফল একটি বড় বিপর্যয়। দলের রক্ষণশীল, ঐতিহ্যবাহী এবং মধ্যপন্থী—সব ধরনের প্রার্থীরাই পরাজয়ের সম্মুখীন হয়েছেন। এটি দলের ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত একটি সামগ্রিক প্রত্যাখ্যানের চিত্র তুলে ধরেছে। এখন বড় প্রশ্ন হলো, রিপাবলিকানরা যদি তাদের রাজনৈতিক যোগাযোগের পদ্ধতি এবং প্রতিশ্রুতিগুলো ঢেলে না সাজান, তবে ভবিষ্যতে তাদের কোনো নির্বাচনে জেতা কি সম্ভব হবে? এমনকি খোদ ভাইস প্রেসিডেন্ট স্বীকার করেছেন যে এই যুদ্ধই নির্বাচনে রিপাবলিকানদের পরাজয়ের কারণ।

জন ফিহেরি বলেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের আমল আমেরিকার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটকে চিরতরে বদলে দিয়েছে। হয়তো আমরা আর কখনোই তিক্ততাহীন রাজনৈতিক মতবিরোধের সেই পুরোনো সোনালি দিনগুলোতে ফিরতে পারব না, তবে বর্তমান ফলাফল এটিই প্রমাণ করে যে জনগণ এখন বিভাজন নয়, ঐক্যবদ্ধ নেতৃত্ব দেখতে চায়। ট্রাম্প এই বার্তাটি সঠিকভাবে বুঝতে পারবেন কি না, সেটিই এখন বড় দেখার বিষয়।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


আমাদের ফেসবুক পেইজ