বিশ্বসংগীতের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র, কান্ট্রি সংগীতের কিংবদন্তি শিল্পী ও গীতিকার ডলি পার্টন আর নেই। গত মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের টেনেসি অঙ্গরাজ্যের ন্যাশভিলে তিনি শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮০ বছর। ডলির প্রতিনিধিদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ক্যানসারের সঙ্গে অল্প সময়ের লড়াইয়ের পর ন্যাশভিলের ভ্যান্ডারবিল্ট-ইনগ্রাম ক্যানসার সেন্টারে স্বজনদের উপস্থিতিতে তিনি মারা যান। তাঁর এই প্রয়াণে কান্ট্রি সংগীতের একটি বর্ণাঢ্য যুগের অবসান ঘটল।
১৯৪৬ সালের ১৯ জানুয়ারি টেনেসির সেভিয়ার কাউন্টির পিটম্যান সেন্টারে ডলি রেবেকা পার্টনের জন্ম। ১২ ভাই-বোনের অভাবী সংসারে এক কক্ষের কাঠের ঘরে কেটেছে তাঁর শৈশব। বাবার কৃষিকাজের আয়ের ওপর নির্ভরশীল সেই পরিবারে দারিদ্র্য নিত্যসঙ্গী থাকলেও সংগীত ছিল ডলির বড় আশ্রয়। মায়ের কাছ থেকে লোকগান ও পাহাড়ি গীত শুনে বড় হওয়া ডলি ছয় বছর বয়সে প্রথম গান লেখেন। আট বছর বয়সে গিটার হাতে তুলে নেওয়া ডলি ১১ বছর বয়সে স্থানীয় বেতারে এবং ১৩ বছর বয়সে মর্যাদাপূর্ণ ‘গ্র্যান্ড ওলে অপ্রি’ মঞ্চে গাওয়ার সুযোগ পান।
স্কুলজীবন শেষ করেই নিজের লেখা গানে ভরা স্যুটকেস নিয়ে ন্যাশভিলে পাড়ি জমান তিনি। শুরুতে অন্য শিল্পীদের জন্য গান লিখলেও, নিজের স্বতন্ত্র কণ্ঠ ও গল্প বলার ক্ষমতায় দ্রুতই শ্রোতাদের নজর কাড়েন। ১৯৭৩ সালে প্রকাশিত ‘জোলিন’ গানটি তাঁর ক্যারিয়ারকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়। ডলি জানিয়েছিলেন, এক লাল চুলের ব্যাংককর্মী তাঁর স্বামীর প্রতি আগ্রহ দেখালে সেই অনিশ্চয়তা থেকেই গানটির জন্ম। এটি শুধু দাম্পত্যের গল্প নয়, বরং প্রিয় মানুষকে হারানোর ভয় ও সম্পর্কের অনিশ্চয়তার এক কালজয়ী প্রকাশ হয়ে ওঠে।
ডলির সংগীতজীবনের আরেকটি মাইলফলক ‘আই উইল অলওয়েজ লাভ ইউ’। দীর্ঘদিনের সহশিল্পী পোর্টার ওয়াগনারের কাছ থেকে পেশাগতভাবে আলাদা হওয়ার সময় তাঁকে সম্মান জানিয়ে এই গানটি লিখেছিলেন তিনি। এলভিস প্রিসলি গানটি গাইতে চাইলেও, স্বত্ব নিয়ে ব্যবস্থাপকের সঙ্গে মতবিরোধ হওয়ায় ডলি তাতে রাজি হননি। তাঁর সেই দূরদর্শী সিদ্ধান্তই পরবর্তীতে ১৯৯২ সালে ‘দ্য বডিগার্ড’ চলচ্চিত্রে হুইটনি হিউস্টনের কণ্ঠে বিশ্বজুড়ে ইতিহাস গড়ে।
নিজের শৈশব ও সাধারণ মানুষের জীবন ছিল ডলির গানের মূল উপজীব্য। ‘কোট অব ম্যানি কালারস’ গানে তিনি মায়ের হাতে তৈরি পুরোনো কাপড়ের কোট ও শৈশবের দারিদ্র্যকে তুলে ধরেছিলেন। এছাড়া ‘নাইন টু ফাইভ’ গানটি কর্মজীবী মানুষের সংগ্রামের প্রতীক হয়ে ওঠে। জীবদ্দশায় প্রায় তিন হাজার গান লিখেছেন তিনি। নিজের অধিকাংশ জনপ্রিয় গানের কথা তাঁর নিজেরই লেখা। তিনি বিশ্বাস করতেন, গান লেখা একধরনের আত্মিক সাধনা, যা তাঁকে সৃষ্টিকর্তার কাছাকাছি নিয়ে যায়।
সংগীতের পাশাপাশি চলচ্চিত্রেও ছিল তাঁর সরব উপস্থিতি। ‘নাইন টু ফাইভ’, ‘দ্য বেস্ট লিটল হোরহাউস ইন টেক্সাস’ ও ‘স্টিল ম্যাগনোলিয়াস’-এর মতো চলচ্চিত্রে অভিনয় করে তিনি প্রশংসা কুড়িয়েছেন। চলচ্চিত্রের গানের জন্য দুবার অস্কারে সেরা মৌলিক গানের মনোনয়নও পেয়েছিলেন তিনি। এছাড়া টেনেসিতে ‘ডলিউড’ নামে বিনোদনকেন্দ্র গড়ে তুলে তিনি স্থানীয়দের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করেছিলেন।
মানবিক কাজেও ডলি ছিলেন অনন্য। ১৯৯৫ সালে ‘ইমাজিনেশন লাইব্রেরি’ চালুর মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে শিশুদের হাতে বিনা মূল্যে ৩০ কোটির বেশি বই পৌঁছে দিয়েছেন তিনি। করোনা মহামারির সময় টিকা গবেষণায় ১০ লাখ মার্কিন ডলার অনুদান দিয়েছিলেন এই শিল্পী। তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবনে ১১টি গ্র্যামি পুরস্কার, গ্র্যামির আজীবন সম্মাননা এবং কান্ট্রি মিউজিক হল অব ফেমে ১৯৯৯ সালে জায়গা করে নেওয়া তাঁর সাফল্যের প্রমাণ।
ব্যক্তিজীবনে ডলি ছিলেন অত্যন্ত বিনয়ী ও রসবোধসম্পন্ন। তাঁর প্রায় ৬০ বছরের জীবনসঙ্গী কার্ল ডিন গত বছরের মার্চে মারা যান। স্বামীর মৃত্যুর পর শারীরিক সমস্যার কারণে তিনি কিছু অনুষ্ঠান বাতিল করেছিলেন। তবে শেষ সময় পর্যন্ত নতুন গান, বই ও নিজের জীবন নিয়ে কাজ করে গেছেন। বিশ্বজুড়ে তাঁর রেকর্ড বিক্রি হয়েছে ১০ কোটির বেশি। কান্ট্রি সংগীতের গণ্ডি পেরিয়ে পপ শ্রোতাদের কাছেও তিনি ছিলেন সমান জনপ্রিয়।
‘হিয়ার ইউ কাম এগেইন’, ‘হার্টব্রেকার’, ‘টু ডোরস ডাউন’ এবং কেনি রজার্সের সঙ্গে গাওয়া ‘আইল্যান্ডস ইন দ্য স্ট্রিম’-এর মতো গানগুলো আজও শ্রোতাদের হৃদয়ে গেঁথে আছে। তাঁর মৃত্যুতে সংগীতজগৎ হারাল এমন এক শিল্পীকে, যিনি নিজের অভিজ্ঞতাকে অসাধারণভাবে প্রকাশ করে প্রজন্মের পর প্রজন্মের শ্রোতার কাছে পৌঁছে দিয়েছিলেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এক নারী আরেক নারীর কাছে তাঁর প্রিয় মানুষটিকে কেড়ে না নেওয়ার আকুতি জানাচ্ছেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ঈর্ষা, ভালোবাসা আর হারানোর ভয়—সহজ কথায় গভীর এই অনুভূতির গান ‘জোলিন’। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: সাত দশকের কর্মজীবনে গান, অভিনয়, ব্যবসা ও মানবিক উদ্যোগের মাধ্যমে কোটি মানুষের জীবনে প্রভাব রেখেছেন তিনি। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ‘জোলিন’-এর নেপথ্যের গল্প প্রথম দিকে ডলির একক গান প্রত্যাশিত সাফল্য পায়নি। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: পরে কান্ট্রি সংগীতের সঙ্গে পপের ছোঁয়া যোগ করে নিজের গানের ধরনে পরিবর্তন আনেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে তাঁর জনপ্রিয়তা। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ১৯৭৩ সালে প্রকাশিত ‘জোলিন’ সেই যাত্রায় বড় মোড় এনে দেয়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: গানটির জন্মও ডলির ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে।