দিনাজপুরের বিরামপুর উপজেলার মুকুন্দপুর ইউনিয়নের বালুপাড়া গ্রামের বাসিন্দা ইয়াকুব আলী এক অদ্ভুত আইনি ও প্রশাসনিক জটিলতায় পড়েছেন। ১৯৯২ সালের ১ ফেব্রুয়ারি জন্ম নেওয়া ইয়াকুবের বয়স যখন মাত্র ছয় বছর, তখনই তার মা আয়েশা বেগম মারা যান। আয়েশা বেগমের সংসারে ইয়াকুব ছাড়াও আইয়ুব আলী ও ইউসুফ আলী নামে আরও দুই ছেলে ছিল। মায়ের মৃত্যুর পর ইয়াকুবের বাবা আজগর আলী দ্বিতীয় বিয়ে করেন মোছা. রেজিনাকে। এই পারিবারিক পরিবর্তনের পরই ইয়াকুবের ব্যক্তিগত নথিপত্রে মায়ের নাম নিয়ে জটিলতার সূত্রপাত ঘটে। ১৯৯৮ সালে মা আয়েশা বেগম তাঁর বড় ছেলে আইয়ুব আলী, মেজ ছেলে ইয়াকুব আলী ও ছোট ছেলে ইউসুফ আলীকে রেখে মারা যান। কাগজে–কলমে সৎমায়ের সন্তান হিসেবে ইয়াকুবের কেটে যাচ্ছে প্রায় দেড় যুগ। তিনি বলেন, ‘আমি (যখন মায়ের নাম পরিবর্তন) করিছি, তখন ওর মা আছিল না। পরে ২০২১ সালে চাকরি ছেড়ে গ্রামের বাড়িতে চলে আসেন। আমি জানি না, ওটা কীভাবে ওখানে (ইউনিয়ন পরিষদ) করিছে। ঢাকার চাকরিরত অবস্থায় বিয়ে করেন ইয়াকুব।
ঘটনার শুরু ২০০৯ সালে, যখন ইয়াকুব ঢাকায় গার্মেন্টসে চাকরির জন্য জন্মসনদ নিতে যান। সেই সময় তার বাবা আজগর আলী ছেলের জন্মসনদে আপন মা আয়েশার পরিবর্তে সৎমা রেজিনার নাম যুক্ত করে দেন। পরবর্তীতে ২০১৫ সালে জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) তৈরির সময়ও সেই ভুল তথ্যই রয়ে যায়। ২০১৬ সালে ইয়াকুব নিজে উদ্যোগী হয়ে জন্মসনদ সংশোধন করে সেখানে আপন মায়ের নাম বসিয়ে নিলেও এনআইডিতে তা অপরিবর্তিত থেকে যায়। ইয়াকুব জানান, বাবার এই সিদ্ধান্তের পেছনে উদ্দেশ্য ছিল সৎমাকে দিয়ে পারিবারিক সম্পত্তির বড় অংশ হাতিয়ে নেওয়া। বিশেষ করে ২০১২ সালে ইয়াকুবের আপন ভাই ইউসুফ আলীর মৃত্যুর পর এই ষড়যন্ত্র আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ২০০৯ সালে ইয়াকুব গার্মেন্টেসে চাকরির জন্য ঢাকায় গেলে জন্মসনদের প্রয়োজন হয়।
আপন মায়ের রেখে যাওয়া সাড়ে পাঁচ বিঘা পৈতৃক জমির মালিকানা বুঝে পেতে ইয়াকুব চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। যদিও মৌখিকভাবে তিনি জমির অংশ ভোগদখল করছেন, কিন্তু নথিপত্রে মায়ের নাম ভিন্ন হওয়ায় জমির খাজনা দেওয়া, নামজারি করা বা বিক্রির ক্ষেত্রে তিনি আইনি বাধার সম্মুখীন হচ্ছেন। এই পরিস্থিতিতে নিজেকে আয়েশা বেগমের সন্তান প্রমাণ করতে ২০২৩ সাল থেকে তিনি বিরামপুর উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তার কার্যালয়ে একের পর এক আবেদন করছেন। তবে ২০২৩, ২০২৪ এবং ২০২৫ সালের প্রতিটি আবেদনই কোনো সুরাহা ছাড়াই বাতিল হয়ে যায়। সর্বশেষ গত ২০ অক্টোবর সব প্রয়োজনীয় নথিপত্রসহ তিনি অনলাইনে নতুন করে আবেদন করেন। তবে বিপত্তি বেধেছে আপন মায়ের রেখে যাওয়া সম্পদের উত্তরাধিকার ঘিরে। আপন ভাইসহ বাকি উত্তরসূরিরা তাঁর মৃত মায়ের রেখে যাওয়া সম্পত্তির ভাগ পেলেও মায়ের নামের বিড়ম্বনায় ইয়াকুব পড়েছেন ভোগান্তিতে।
ইয়াকুবের করা এই অভিযোগের বিষয়ে তার বাবা আজগর আলী ভিন্ন মত পোষণ করেছেন। তিনি দাবি করেন, যখন জন্মসনদ তৈরি করা হয়েছিল, তখন ইয়াকুবের মা বেঁচে ছিলেন না এবং এই পরিবর্তনে তার কোনো ভূমিকা ছিল না। সৎমা রেজিনা এ বিষয়ে কথা বলতে অস্বীকৃতি জানালেও, বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে চলছে নানা গুঞ্জন। ইয়াকুব এখন কার্যত সরকারি দপ্তরে দপ্তরে ঘুরে হয়রান হচ্ছেন, অথচ মিলছে না কোনো সমাধান।
এই জটিলতা নিরসনের বিষয়ে জানতে চাইলে বিরামপুর উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা আবদুল হাকিম মণ্ডল জানান, ইয়াকুব আলীর আবেদনটি বর্তমানে ‘ঘ’ ক্যাটাগরিতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এই ধরনের জটিল সমস্যার সমাধান উপজেলা পর্যায় থেকে দেওয়া সম্ভব নয়। তিনি আরও বলেন, বিষয়টি সরাসরি বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের মহাপরিচালক কর্তৃক নির্ধারিত হয়। মহাপরিচালক যদি মনে করেন, তবে তিনি বিষয়টি তদন্তের জন্য নির্দেশ দিতে পারেন। কমিশন তদন্তের আদেশ দিলে কেবল তখনই উপজেলা কার্যালয় থেকে মাঠ পর্যায়ে তদন্ত সাপেক্ষে প্রতিবেদন পাঠানো সম্ভব হবে।