যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরের উপকণ্ঠে একটি হিন্দু মন্দিরে বড় ধরনের হামলার ছক কষার দায়ে ১৯ বছর বয়সী আলেক্সান্দ্রোস পাপোরাকিস নামে এক তরুণকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তার বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী হুমকি দেওয়া এবং অবৈধভাবে রাইফেল রাখার গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছে। ঘটনাটি গত ১১ অক্টোবর ইলিনয় অঙ্গরাজ্যের অরোরা শহরে অবস্থিত শ্রী ভেঙ্কটেশ্বর স্বামী (বালাজি) মন্দির এলাকায় ঘটে। পাশাপাশি, রোববারকে (১১ অক্টোবর) তিনি বিশেষ দিন বলেও উল্লেখ করেছিলেন বলে আদালতে জানিয়েছেন আইনজীবীরা। পুলিশের দাবি, রোববার (১১ অক্টোবর) পাপোরাকিস এক সহকর্মীকে জানান, তার বন্দুক আটকে যাওয়ায় তিনি দ্রুত সেখান থেকে চলে এসেছেন। তবে আবার চেষ্টা করবেন বলেও হুমকি দেন। আইনজীবীদের ভাষ্য অনুযায়ী, পাপোরাকিস আট পৃষ্ঠার একটি নথিও পাঠিয়েছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় অঙ্গরাজ্যের অষ্টম কংগ্রেশনাল জেলার প্রতিনিধি রাজা কৃষ্ণমূর্তি জানান, তিনিও রোববার (১১ অক্টোবর) ওই মন্দিরে গিয়েছিলেন। পুলিশ ও আইনজীবীদের বক্তব্যকে অভিযোগ হিসেবে বিবেচনা করার আহ্বান জানিয়ে কার্যালয়টি বলেছে, তদন্ত এগোনোর সঙ্গে সঙ্গে মামলার তথ্য ও পরিস্থিতিতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসতে পারে। তিনি অভিযোগ করেন, অভিবাসী ও ভিন্ন বর্ণের মানুষদের নিয়ে রাজনৈতিক বক্তব্য বিদ্বেষ বাড়াতে ভূমিকা রাখতে পারে। সম্প্রতি টেক্সাসের এক রিপাবলিকান রাজনীতিকের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দক্ষিণ এশীয় শিক্ষার্থীদের নিয়ে করা মন্তব্যের কথাও তিনি উল্লেখ করেন।
পুলিশ ও তদন্ত কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, ঘটনার দিন দুপুর ১২টা ২৫ মিনিটের দিকে মন্দিরের পার্কিং লটে পাপোরাকিসের নিবন্ধিত লাল রঙের একটি গাড়ি দেখা যায়। মাত্র ১৫ মিনিটের মাথায় সেখান থেকে গাড়িটি চলে যায়। একই দিন বিকেলে নিজ বাড়ির কাছাকাছি এলাকা থেকে পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে। তার গাড়িতে পাওয়া তথ্যে বেরিয়ে আসে যে, মন্দিরে থাকা লোকজনকে লক্ষ্য করেই সে হামলার প্রস্তুতি নিয়েছিল।
পাপোরাকিসের সহকর্মীরা পুলিশকে জানান, ঘটনার আগে সে একটি খাবারের দোকানে ভারতীয়দের লক্ষ্য করে প্রাণঘাতী হুমকির কথা বলেছিল। সে এআর-ধরনের রাইফেলের ছবি ও কৌশলগত পোশাক পরা নিজের ছবিও অন্যদের পাঠায়। তল্লাশির সময় তার বাড়িতে নম্বরবিহীন রাইফেল, প্রচুর পরিমাণ গুলি, নাৎসি প্রতীকচিহ্ন এবং আট পৃষ্ঠার একটি বর্ণবাদী নথি পাওয়া গেছে, যেখানে অশ্বেতাঙ্গদের ওপর হামলার পরিকল্পনার বিস্তারিত উল্লেখ ছিল। এর আগে, একটি খাবারের দোকানে পাপোরাকিসের সহকর্মীরা ৯১১ নম্বরে ফোন করে পুলিশকে জানান, তিনি ভারতীয়দের হত্যা করতে আর তর সইছে না বলে মন্তব্য করেছেন। ওই নথিতে নিজেকে শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদী ও নব্য নাৎসি হিসেবেও পরিচয় দিয়েছিলেন তিনি। তবে পাপোরাকিসের পক্ষে থাকা কুক কাউন্টির সরকারি আইনজীবী কার্যালয় এক বিবৃতিতে বলেছে, মামলাটি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে এবং তদন্তে দীর্ঘ সময় লাগতে পারে।
ঘটনার পর মন্দির কর্তৃপক্ষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করেছে এবং সশস্ত্র নিরাপত্তারক্ষী মোতায়েন করেছে। ইলিনয়ের কংগ্রেসম্যান রাজা কৃষ্ণমূর্তি জানান, সেদিন মন্দিরটিতে অনেক ভক্ত উপস্থিত ছিলেন এবং বন্দুক জ্যাম হওয়ার কারণেই বড় ধরনের ট্র্যাজেডি এড়ানো সম্ভব হয়েছে। তিনি এটিকে বিদ্বেষপ্রসূত অপরাধ হিসেবে তদন্তের জন্য কেন্দ্রীয় সংস্থার প্রতি দাবি জানিয়েছেন। অরোরা শহরের মেয়র জন ল্যাশ জানিয়েছেন, শহরের অন্যান্য মন্দিরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে স্থানীয় প্রশাসন সতর্ক রয়েছে। এক বিবৃতিতে তারা জানায়, মন্দিরের ভক্ত, কর্মী ও স্বেচ্ছাসেবকদের নিরাপত্তা তাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। এ কারণে অবিলম্বে অতিরিক্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং সশস্ত্র নিরাপত্তাকর্মীর উপস্থিতি বাড়ানো হয়েছে। পাশাপাশি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরাপত্তা জোরদারে কেন্দ্রীয় সরকারের অনুদান ছাড় করারও দাবি জানিয়েছেন তিনি।
বর্তমানে পাপোরাকিস কারাগার হেফাজতে রয়েছেন এবং আগামী ৩০ অক্টোবর তার মামলার পরবর্তী শুনানি অনুষ্ঠিত হবে। তদন্তের প্রয়োজনে পুলিশ তার মাকেও জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। এদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ এশীয় ও হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে এই ঘটনায় গভীর আতঙ্ক বিরাজ করছে।
এশীয় আমেরিকানদের বিরুদ্ধে ক্রমবর্ধমান বিদ্বেষের তথ্য সংগ্রহকারী প্রতিষ্ঠান ‘স্টপ এএপিআই হেট’ জানিয়েছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশটিতে এশীয়দের ওপর হামলার ঝুঁকি বেড়েছে। সংস্থার সহপ্রতিষ্ঠাতা মঞ্জুশা কুলকার্নি বলেন, যদিও এই হামলা নস্যাৎ করা সম্ভব হয়েছে, তবে রাজনৈতিক বক্তৃতার ফলে যে বিদ্বেষ তৈরি হচ্ছে তা থেকে হিন্দু ও দক্ষিণ এশীয়রা নিরাপদ বোধ করছেন না। বর্তমানে নবরাত্রি উৎসব চলাকালীন মন্দিরটিতে ভক্তদের মধ্যে চরম উদ্বেগ বিরাজ করছে।