বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:২৯ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম :
প্রেক্ষাপট: তারেক রহমানের ভারত সফর নিয়ে নতুন কোনো তথ্য নেই: রণধীর জয়সোয়াল কৃষি ও মৎস্য খাতে ১০ হাজার কর্মী নেবে ওমান: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ভারতবিরোধী কর্মকাণ্ডে শ্রীলঙ্কার মাটি ব্যবহার হবে না: প্রেসিডেন্ট দিসানায়েকে ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে ফল ২০২৬ সেমিস্টারের নবীনবরণ অনুষ্ঠিত রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ে প্রশাসনিক কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ পেলেন নবাব হোসেন ছবি ছাড়া জাতীয় পরিচয়পত্র নয়: হাইকোর্টের রুল খারিজ ভোলায় সার কারখানা ও নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা সরকারের ফ্যাশন জগতে চার দশক: আবু জানি ও সন্দীপ খোসলার বর্ণিল উদযাপন ভবিষ্যতে আকস্মিক গ্যাস সংকট মোকাবিলায় বড় পরিকল্পনা সরকারের: প্রধানমন্ত্রী সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক থেকে দুই দিনে ৫৮১ কোটি টাকা তুলেছেন ১৩ হাজার গ্রাহক

৭৮ বছরে উত্তর কোরিয়া: কিম পরিবারের তিন প্রজন্মের টিকে থাকার নেপথ্যে কী?

প্রতিবেদকের নাম

১৯৪৮ সালের ৯ সেপ্টেম্বর উত্তর কোরিয়ার আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়। আজ ৯ সেপ্টেম্বর দেশটির ৭৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। দীর্ঘ এই সাত দশকের বেশি সময়ে উত্তর কোরিয়াকে নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। যুদ্ধ, ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ, অর্থনৈতিক বিপর্যয়, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এবং দীর্ঘদিনের বৈশ্বিক বিচ্ছিন্নতা সত্ত্বেও দেশটির শাসনব্যবস্থা টিকে আছে। বরং কিম পরিবারের তিন প্রজন্মের নেতৃত্বে উত্তর কোরিয়া তার নিজস্ব ধারায় রাষ্ট্র পরিচালনা অব্যাহত রেখেছে।

কোরীয় উপদ্বীপের ইতিহাস বিশদভাবে দেখলে বোঝা যায়, ১৯১০ থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত এই অঞ্চল জাপানের অধীনে ছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপানের পরাজয়ের পর যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন কোরিয়াকে সাময়িকভাবে দুই ভাগে বিভক্ত করে। ৩৮তম অক্ষরেখাকে কেন্দ্র করে এই বিভাজন পরে স্থায়ী রূপ নেয়। উত্তরে কিম ইল–সুং এবং দক্ষিণে সিংম্যান রি ক্ষমতায় বসেন। ১৯৪৮ সালে দুই অংশে দুটি আলাদা রাষ্ট্র গঠিত হয় এবং উভয় পক্ষই পুরো উপদ্বীপের বৈধ সরকার হিসেবে নিজেদের দাবি করে। এই বিরোধের জের ধরে ১৯৫০ সালের জুনে উত্তর কোরিয়া দক্ষিণে হামলা চালালে কোরীয় যুদ্ধের সূত্রপাত হয়। ১৯৫৩ সালে যুদ্ধবিরতি স্বাক্ষরিত হলেও দুই কোরিয়ার মধ্যে কোনো স্থায়ী শান্তি চুক্তি হয়নি।

উত্তর কোরিয়ার প্রতিষ্ঠাতা কিম ইল–সুং ১৯৪৮ থেকে ১৯৯৪ সালে মৃত্যুর আগপর্যন্ত দেশটি শাসন করেন। তাঁর সময়েই একদলীয় ও অত্যন্ত কেন্দ্রীভূত শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়। তিনি ‘জুচে’ বা নিজ শক্তির ওপর নির্ভর করার রাজনৈতিক দর্শন সামনে আনেন, যার মূলকথা ছিল রাজনীতি, অর্থনীতি ও প্রতিরক্ষায় বাইরের ওপর নির্ভর না করা। কিম ইল–সুং তাঁর জীবদ্দশাতেই ছেলে কিম জং–ইলকে গুরুত্বপূর্ণ পদে বসিয়ে উত্তরাধিকার নিশ্চিত করেছিলেন।

১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর উত্তর কোরিয়া বড় ধরনের অর্থনৈতিক সংকটে পড়ে। নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি সময়ে সেখানে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের তথ্যমতে, এই দুর্ভিক্ষে প্রায় ১০ লাখ মানুষ প্রাণ হারিয়েছিল। এমন বিপর্যয়ের মুখেও কিম জং–ইল ‘সামরিক বাহিনী প্রথম’ নীতি গ্রহণ করে শাসনক্ষমতা ধরে রাখেন। এই সময়েই দেশটি পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচির দিকে দ্রুত ধাবিত হয়। ২০০৩ সালে এনপিটি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার ঘোষণা এবং ২০০৬ সালে প্রথম পারমাণবিক পরীক্ষা উত্তর কোরিয়ার নিরাপত্তাকৌশল বদলে দেয়।

২০১১ সালের ডিসেম্বরে কিম জং–ইলের মৃত্যুর পর তাঁর ছেলে কিম জং–উন ক্ষমতায় আসেন। শুরুতে তাঁর অভিজ্ঞতা নিয়ে সংশয় থাকলেও দ্রুতই তিনি দল, সরকার ও সেনাবাহিনীর ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর শাসনামলে পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি আরও গতিশীল হয়েছে। ২০০৬ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে দেশটি ছয়টি পারমাণবিক পরীক্ষা চালিয়েছে, যার চারটিই হয়েছে কিম জং–উনের সময়ে।

কূটনীতির ক্ষেত্রে ২০১৮ সালে কিম জং–উন দক্ষিণ কোরিয়ার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট মুন জে–ইন এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠক করেন। তবে ২০১৯ সালের হ্যানয় সম্মেলনে পারমাণবিক কর্মসূচি ও নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার নিয়ে মতপার্থক্যের কারণে কোনো চুক্তি ছাড়াই আলোচনা শেষ হয়। বর্তমানে উত্তর কোরিয়া নিজেদের পারমাণবিক অস্ত্রধর রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করেছে এবং ২০২২ সালে এ সংক্রান্ত নতুন আইন পাস করেছে।

কিম জং–উনের শাসন আরও সুসংহত হয়েছে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত ওয়ার্কার্স পার্টির নবম কংগ্রেসের মাধ্যমে। সেখানে দলের নিয়মে পরিবর্তন এনে কিম জং–উনের ভূমিকা ও কর্তৃত্বকে আরও প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ার গোয়েন্দা সংস্থার গবেষণা অনুযায়ী, একে ‘কিম জং–উন যুগ ২.০’ হিসেবে অভিহিত করা হচ্ছে।

মানবাধিকার পরিস্থিতির বিষয়ে জাতিসংঘের ২০২৫ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত এক দশকে উত্তর কোরিয়ায় নজরদারি, বাধ্যতামূলক শ্রম ও কঠোর শাস্তির ব্যবহার কমেনি। যদিও পিয়ংইয়ং এসব অভিযোগ বরাবরই প্রত্যাখ্যান করে আসছে। তথ্যের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ এবং নিরাপত্তা সংস্থার নজরদারি দেশটিতে বিরোধী শক্তি গড়ে ওঠার সুযোগ সীমিত করে রেখেছে।

অর্থনৈতিকভাবে দেশটির সাধারণ মানুষের জীবন এখনো কঠিন। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির হিসাব অনুযায়ী, প্রায় ১ কোটি ৭ লাখ মানুষ অপুষ্টিতে ভুগছে এবং পাঁচ বছরের কম বয়সী প্রতি পাঁচ শিশুর একজন অপুষ্টির শিকার। তবে সাম্প্রতিক সময়ে অর্থনীতিতে কিছুটা প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। দক্ষিণ কোরিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যমতে, ২০২৫ সালে উত্তর কোরিয়ার অর্থনীতি ৩ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়েছে। এর পেছনে চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্যের ভূমিকা রয়েছে।

ইউক্রেন যুদ্ধের পর রাশিয়ার সঙ্গে উত্তর কোরিয়ার সম্পর্ক নতুন মাত্রা পেয়েছে। পিয়ংইয়ং রাশিয়াকে অস্ত্র ও সেনাসদস্য দিয়ে সহায়তা করছে, বিনিময়ে পাচ্ছে অর্থনৈতিক ও সামরিক সুবিধা। ২০২৪ সালে দুই দেশ একটি ব্যাপক কৌশলগত অংশীদারত্ব চুক্তি করেছে এবং সম্প্রতি তাদের মধ্যে প্রথম সড়কসেতু চালু হয়েছে। ‘৩৮ নর্থ’–এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, রাশিয়াকে সহায়তার মাধ্যমে উত্তর কোরিয়া আধুনিক সামরিক প্রযুক্তি ও যুদ্ধের অভিজ্ঞতা অর্জনের চেষ্টা করছে।

আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থা (আইএইএ) জানিয়েছে, ইয়ংবিয়নের পারমাণবিক কেন্দ্রে নতুন একটি ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ স্থাপনা তৈরি করা হয়েছে, যেখানে ২৮টি পর্যন্ত সেন্ট্রিফিউজ ক্যাসকেড থাকতে পারে। ৭৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং কিম জং–উনকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: প্রতিষ্ঠার পর গত ৭৮ বছরে উত্তর কোরিয়া যুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ, অর্থনৈতিক বিপর্যয়, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ও দীর্ঘ বিচ্ছিন্নতার মধ্য দিয়ে গেছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এ সময় সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙেছে, পূর্ব ইউরোপের সমাজতান্ত্রিক শাসন বিলুপ্ত হয়েছে এবং চীন বাজার অর্থনীতির পথে অনেক দূর এগিয়েছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: উত্তর অংশের নাম হয় ডেমোক্রেটিক পিপলস রিপাবলিক অব কোরিয়া বা উত্তর কোরিয়া। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: রাষ্ট্র, ক্ষমতাসীন ওয়ার্কার্স পার্টি, সেনাবাহিনী ও নিরাপত্তাব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ ক্রমে একজন নেতাকে ঘিরে সাজানো হয়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: কিম ইল–সুংয়ের শাসনে নেতাকে ঘিরে প্রবল ব্যক্তিপূজাও গড়ে ওঠে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: রাষ্ট্রের ইতিহাস, স্বাধীনতা, যুদ্ধ ও উন্নয়নের সব সাফল্যের কেন্দ্রে তাঁকে রাখা হয়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এভাবে কিম পরিবারের শাসনকে শুধু রাজনৈতিক ব্যবস্থা নয়, উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের অংশে পরিণত করা হয়।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


আমাদের ফেসবুক পেইজ