বিচার বিভাগে আর্থিক দুর্নীতি যতটা ক্ষতি করেছে, তার চেয়েও অনেক বেশি ক্ষতি করেছে বুদ্ধিবৃত্তিক দুর্নীতি—এমন মন্তব্য করেছেন আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। তিনি স্পষ্ট জানান যে অধস্তন আদালতের বিচারকরা অত্যন্ত মেধার স্বাক্ষর রেখে সকাল ৯টা থেকে রাত ৮-৯টা পর্যন্ত নিরন্তর কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে কিছু ব্যক্তি ও বুদ্ধিবৃত্তিক পক্ষপাত বিচার ব্যবস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
রোববার (৮ নভেম্বর) রাজধানীর একটি হোটেলে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) আয়োজিত এবং জাতিসংঘের উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) সহযোগিতায় অধস্তন আদালতের বিচারকদের জন্য ‘বিচারিক কার্যক্রমে শুদ্ধাচার’ বিষয়ক তিন দিনব্যাপী কর্মশালার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
আইনমন্ত্রী বলেন, একজন বিচারকের নামের আগে ‘সৎ জজ’ উপাধি ব্যবহার করা কিছুটা অতিরঞ্জিত। কারণ একজন মানুষ যখন বিচারক হিসেবে নিয়োগ পান, তখন তিনি সব কিছুর ঊর্ধ্বে থেকে সততা রক্ষা করবেন—এটাই স্বাভাবিক ও সাধারণ প্রত্যাশা। দেশে বিচার বিভাগের যে শুদ্ধাচার সংক্রান্ত সমস্যা আলোচনায় আসছে, সেটিকে অনেকে আর্থিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলেও তিনি মূলত বুদ্ধিবৃত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই বিষয়টি বিবেচনা করছেন। এই সময়ে সবচেয়ে মেধাবীদেরই বিচারক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, হাতে গোনা সামান্য কয়েকজন বিচারক হয়তো আর্থিক দুর্নীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছেন। যাদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে, তাদের বিষয়ে বর্তমান সরকার এবং মাননীয় প্রধান বিচারপতি সম্পূর্ণ ‘জিরো টলারেন্স’ বা শূন্য সহনশীলতা নীতি বাস্তবায়নের সর্বাত্মক চেষ্টা করছেন।
অনুষ্ঠানে টিআইবির প্রতি আহ্বান জানিয়ে আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান বলেন, বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে যারা চরম পক্ষপাতদুষ্ট, দুর্নীতিগ্রস্ত এবং যারা আমাদের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্টকে বিতর্কিত বা প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন, তাদের স্পষ্টভাবে শনাক্ত করা উচিত। তাদের অপকর্মের বিরুদ্ধে টিআইবিসহ সংশ্লিষ্টদের সোচ্চার হওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।
তিনি আফসোস প্রকাশ করে বলেন, বর্তমানে আমাদের গোটা সমাজে ও বুদ্ধিবৃত্তিক অঙ্গনে চরম বিভাজন তৈরি হয়েছে। উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, গত জুলাই মাসে দেশের অনেক মানুষ নিহত ও পঙ্গুত্ববরণ করলেও বুদ্ধিজীবীদের একটি বড় অংশ এ বিষয়ে সম্পূর্ণ নীরব ভূমিকা পালন করেছিলেন। ফলে বিচার বিভাগের শুদ্ধাচার বজায় রাখার পাশাপাশি এই বুদ্ধিবৃত্তিক দুর্নীতির প্রতিরোধ নিয়েও সুনির্দিষ্ট আলোচনার প্রয়োজন রয়েছে।
বিচার বিভাগের জন্য পৃথক সচিবালয় গঠন এবং বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত করার প্রসঙ্গে আইনমন্ত্রী বলেন, বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এসব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে পুরোপুরি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। বিচার ব্যবস্থার সার্বিক স্বচ্ছতা ও স্বাধীনতা আনায় সংবিধান সংশোধনের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় কাজ ইতিমধ্যে দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে।
উক্ত কর্মশালার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ইউএনডিপি বাংলাদেশের রুল অব ল, জাস্টিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটসের সিনিয়র অ্যাডভাইজার রোমানা শোয়েগার এবং টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান সহ বিচার বিভাগ ও বিভিন্ন সংস্থার অন্যান্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।