লোহিত সাগর ও বাব আল-মানদেব প্রণালিতে হুতিদের সাম্প্রতিক হামলা বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহের শৃঙ্খলকে চরম ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। এটি এমন এক গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ, যা হরমুজ প্রণালির ওপর বৈশ্বিক নির্ভরতা কমানোর অন্যতম উপায় ছিল। অথচ সেই হরমুজ প্রণালি নিজেও বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতায় চাপের মুখে রয়েছে। সৌদি আরবের পূর্ব-পশ্চিম তেল পাইপলাইন মেরামতের উদ্যোগ নিলেও সামগ্রিক ঝুঁকির তেমন হেরফের হয়নি, বরং অন্য রপ্তানিপথগুলোর ওপর চাপ আরও বেড়েছে। এই পরিস্থিতি আবারও আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, তেলের ওপর নির্ভরশীল বিশ্ব অর্থনীতি কতটা ভঙ্গুর। এটি ব্যয়বহুল বা সীমিত পরিসরের প্রযুক্তিও নয়।
গত ৬০ বছর ধরে আমরা বারবার একই ধরনের জ্বালানি সংকটের মুখোমুখি হয়েছি। জরুরি পরিবহনব্যবস্থায় এমন এক জ্বালানির ওপর আমাদের অতি-নির্ভরশীলতা রয়ে গেছে, যা আন্তর্জাতিক বাজারে কেনাবেচা হয় এবং যার সিংহভাগ আসে রাজনৈতিকভাবে অস্থিতিশীল অঞ্চল থেকে। এই মৌলিক দুর্বলতার খুব একটা পরিবর্তন গত ছয় দশকে হয়নি। তবে এবারের সংকট থেকে ভিন্ন এক সম্ভাবনার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। বিগত ৬০ বছরের তেলসংকটগুলোর মধ্যে এটিই প্রথম ঘটনা, যেখানে তেলের একটি নির্ভরযোগ্য বিকল্প আর কেবল গবেষণাগারের সীমাবদ্ধতায় নেই। বৈদ্যুতিক যানবাহন এখন অর্থনৈতিকভাবে বাস্তবসম্মত এবং প্রতিযোগিতামূলক একটি প্রযুক্তি হিসেবে সামনে এসেছে।
স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ ব্যবহার করে পরিবহনব্যবস্থাকে দ্রুত বিদ্যুতায়িত করা সম্ভব। সৌরবিদ্যুৎ, ব্যাটারি, বৈদ্যুতিক গাড়ি, বাস ও ট্রাক—সবই এখন সহজলভ্য। এমনকি কৃষি ও খনিশিল্পের যন্ত্রপাতিগুলোও বিদ্যুতের মাধ্যমে চালানো সম্ভব, যা আমদানিকৃত তেলের ওপর নির্ভরশীলতা অনেকটাই কমিয়ে আনবে। চীনে ব্যাপক উৎপাদনের ফলে এসব প্রযুক্তির দাম দ্রুত হ্রাস পেয়েছে, ফলে পরিবহন খাতের বিদ্যুতায়ন এখন বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও সুবিধাজনক।
তেল সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং বৈশ্বিক রাজনৈতিক সংঘাত এই রূপান্তরকে আরও ত্বরান্বিত করছে। হুতিদের হামলা মালবাহী ট্রাক ও ভারী যানবাহনের বিদ্যুতায়নের চাহিদাকে বাড়িয়ে দিয়েছে। চীনের মতো দেশগুলো ইতিমধ্যে মালবাহী পরিবহনের বিদ্যুতায়ন শুরু করেছে এবং তারা বৈদ্যুতিক ট্রেন ও ট্রাক বিশ্ববাজারে রপ্তানির প্রস্তুতি নিচ্ছে। এরপরই কৃষি ও খনিশিল্পের যন্ত্রপাতি বিদ্যুতায়নের পালা। অথচ বর্তমানে এসব খাতে ডিজেলই প্রধান জ্বালানি। অস্ট্রেলিয়া সরকার ৪০ বছরের বেশি সময় ধরে ডিজেলে বড় ধরনের ভর্তুকি দিয়ে আসছে, যা এই নির্ভরতাকে আরও দীর্ঘায়িত করেছে। এখন এই ভর্তুকি কমিয়ে বৈদ্যুতিক প্রযুক্তিতে প্রণোদনা দেওয়া সময়ের দাবি। ইরানের যুদ্ধ এ প্রবণতাকে আরও ত্বরান্বিত করেছে। বিশ্বরাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের অব্যাহত সম্পৃক্ততাও সেই সংঘাতকে দীর্ঘায়িত করেছে। হুতিরা যে কারণে সরাসরি ইরান যুদ্ধে জড়াল। হুতিদের সঙ্গে যুদ্ধে আমেরিকা কেন পিছু হটল। গোয়েন্দা যুদ্ধে বিপাকে হুতিরা, হাতছাড়া হতে পারে জয়।
চীন প্রযুক্তির দাম কমানোর ক্ষেত্রে যেভাবে নেতৃত্ব দিচ্ছে, তাতে ডিজেলের বিকল্প প্রযুক্তি গ্রহণের ক্ষেত্রে তারা বিশ্বকে পথ দেখাচ্ছে। তবে এই রূপান্তরের জন্য পর্যাপ্ত নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ নিশ্চিত করা জরুরি। তেলনির্ভরতা থেকে বেরিয়ে আসার জন্য এটি একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত। এটি শহরের ছাদে ছোট পরিসরে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের মতো নয়; এর জন্য প্রয়োজন বড় ধরনের আঞ্চলিক অবকাঠামো। দ্রুত চার্জিং কেন্দ্র ও সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের মাধ্যমে এই নতুন অর্থনীতির ভিত্তি তৈরি করা সম্ভব।
এই নতুন প্রযুক্তি কেবল জ্বালানি নিরাপত্তা নয়, বরং গ্রামীণ ও আঞ্চলিক অর্থনীতিতে নতুন প্রাণের সঞ্চার করবে। ছোট শহরগুলোতে প্রযুক্তির সেবা ও রক্ষণাবেক্ষণকেন্দ্র গড়ে উঠলে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। সরকার ও ব্যবসায়ীদের উচিত এখনই ‘স্থানীয় নবায়নযোগ্য জ্বালানি কেন্দ্র’ স্থাপনের পরিকল্পনা করা। এতদিন নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে কেবল শহরে বিদ্যুৎ দেওয়ার মাধ্যম হিসেবে দেখা হতো, এখন ছোট শহরগুলোকে তাদের নিজস্ব অঞ্চলের অর্থনীতির চালিকাশক্তি হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। সরকারি সহায়তা দিলে বর্জ্য ও অবশিষ্ট কাঁচামাল থেকে উৎপাদিত জ্বালানিকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।
ডিজেলের বিকল্প হিসেবে বৈদ্যুতিক প্রযুক্তি যেখানেই ব্যবহারের সুযোগ আছে, সেখানে বিদ্যুৎকেই প্রধান জ্বালানি হিসেবে বেছে নিতে হবে। পুরোপুরি রূপান্তরের আগ পর্যন্ত টেকসই জৈব জ্বালানি বা নবায়নযোগ্য ডিজেল পুরোনো যন্ত্রপাতিতে ব্যবহার করা যেতে পারে, কিন্তু এর ব্যবহার সীমিত রাখা জরুরি। ফসল থেকে জ্বালানি তৈরির ক্ষেত্রে জমি, পানি, খাদ্যনিরাপত্তা ও জীববৈচিত্র্যের মতো বিষয়গুলো মাথায় রাখতে হবে। বর্জ্য থেকে জ্বালানি তৈরির ক্ষেত্রেও স্বচ্ছ হিসাব ও টেকসই ব্যবস্থাপনার মানদণ্ড নিশ্চিত করতে হবে, যাতে খাদ্য উৎপাদনের জমি কমিয়ে দীর্ঘমেয়াদী তরল জ্বালানিনির্ভরতা আবার তৈরি না হয়।
সবশেষে, তেলনিরাপত্তার এই সুযোগ সরকার, ব্যবসা ও সাধারণ মানুষকে সম্মিলিতভাবে কাজে লাগাতে হবে। তেলমুক্ত ভবিষ্যতের দিকে দ্রুত এগিয়ে যাওয়ার জন্য এটি এক মাহেন্দ্রক্ষণ। অস্ট্রেলিয়া শহরে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের ক্ষেত্রে যে উদাহরণ সৃষ্টি করেছে, গ্রামীণ ও আঞ্চলিক শিল্পে বৈদ্যুতিক প্রযুক্তি গ্রহণের মাধ্যমে বিশ্বের সামনে একই নজির স্থাপনের সুযোগ তাদের রয়েছে। তাই এর বাণিজ্যিক সুযোগও কাজে লাগাতে হবে।
উল্লেখ্য, জাস্টিন ম্যাকম্যানাস অস্ট্রেলিয়ার জ্বালানি, পরিবহন ও আঞ্চলিক উন্নয়নবিষয়ক একজন লেখক ও বিশ্লেষক। এই নিবন্ধটি অস্ট্রেলিয়ান ফাইন্যান্সিয়াল রিভিউ থেকে নেওয়া হয়েছে এবং এর অনুবাদ করেছেন সারফুদ্দিন আহমেদ।