বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশিদের মৃত্যুর ঘটনা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত—এই ২৭৩ দিনে দেশে এসেছে মোট ৪ হাজার ৬০টি মরদেহ। অর্থাৎ, প্রতিদিন গড়ে ১৪ জনেরও বেশি কর্মীর নিথর দেহ দেশে ফিরছে। পরিসংখ্যান বলছে, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে মৃত্যুর হার সবচেয়ে বেশি, যার শীর্ষে রয়েছে সৌদি আরব। এ বছর শুধু সৌদি আরব থেকেই প্রায় ২ হাজার কর্মীর মরদেহ দেশে এসেছে। এছাড়া মালয়েশিয়ায় কর্মসংস্থান গত আড়াই বছর ধরে বন্ধ থাকলেও সেখান থেকেও নিয়মিত আসছে মরদেহ।
প্রবাসে কোনো কর্মীর মৃত্যু হলে মরদেহ দেশে আনার দায়িত্ব পালন করে প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড। মরদেহ দেশে আনা ও সহায়তার ক্ষেত্রে প্রায়ই স্বজনদের দীর্ঘ ভোগান্তির শিকার হতে হয়। পাবনার আল আমিনের অভিজ্ঞতাই এর বড় উদাহরণ। কম্বোডিয়ার একটি টাইলস কারখানায় কাজ করার সময় শতাধিক টাইলসের নিচে চাপা পড়ে মারা যান তিনি। ২০২৫ সালের ১২ এপ্রিল তাঁর মৃত্যুর পর মরদেহ দেশে পৌঁছাতে সময় লেগেছে প্রায় দেড় বছর, যা গত ২৭ সেপ্টেম্বর দেশে আসে। কম্বোডিয়ায় বাংলাদেশের কোনো দূতাবাস না থাকায় তাঁর পরিবারকে মরদেহ খুঁজে পেতে ও দেশে আনতে চরম প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয়েছিল। মৃত্যুর খবর পেয়ে ঢাকায় এসে বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের সহায়তায় ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডে আবেদন করে আল আমিনের শ্যালক মাসুম খান। কল্যাণ বোর্ড থেকে আবেদনটি পাঠানো হয় থাইল্যান্ডে। মরদেহটি কোথায় আছে, তা খুঁজে বের করতে পারেনি দূতাবাস। মূলত করোনা মহামারির সময় অনেকে মরদেহ দেশে না এনে স্থানীয়ভাবে দাফন করেন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিদেশে প্রবাসী মৃত্যুর কারণ নিয়ে এক ধরনের অস্পষ্টতা রয়েছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে মৃত্যুর কারণ হিসেবে ‘স্বাভাবিক মৃত্যু’ লিখে দেওয়া হয়। অভিবাসন খাতের গবেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে অবকাঠামো নির্মাণ খাতে কর্মরত শ্রমিকদের প্রচণ্ড উত্তাপ এবং কর্মক্ষেত্রের কঠোর চাপের মধ্যে কাজ করতে হয়। অতিরিক্ত তাপমাত্রার কারণে শরীর ও শরীরের বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গের দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি হয়, যা অকালমৃত্যুর অন্যতম কারণ। অথচ মৃত্যুর প্রকৃত কারণগুলো সরকারিভাবে যাচাই করার সুযোগ খুব কমই রয়েছে। এ বছরের প্রথম ৯ মাসে আসা মরদেহের ৬৬ শতাংশের সনদে ‘স্বাভাবিক মৃত্যু’ লেখা হয়েছে, আর ৩৪ শতাংশ মৃত্যু হয়েছে দুর্ঘটনা বা অন্য কারণে।
দুর্ঘটনার পরিসংখ্যানও বেশ উদ্বেগজনক। ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের তথ্যমতে, ২০১৮ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত ৫ বছরে মোট ১৮ হাজার ১৬৬টি মরদেহ দেশে এসেছে। এর মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনা, কর্মস্থলে দুর্ঘটনা, অগ্নিকাণ্ড ও বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা গেছেন ৩ হাজার ৬৯৮ জন। এর মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর হার সবচেয়ে বেশি, যা মোট সংখ্যার প্রায় ২০ শতাংশ। সম্প্রতি নোয়াখালীর দুই ভাই, ফয়েজ ও সুজন আহম্মেদ, সৌদি আরবে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন। গত ১৬ জুলাই দুর্ঘটনার পর ২৮ জুলাই তাদের মরদেহ দেশে পৌঁছায়। ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের তথ্য বলছে, ২০১৯ সালে ৩ হাজার ৬৫১ প্রবাসীর মরদেহ আসে দেশে। ২০২০ সালে এটি কমে হয় ৩ হাজার ১৪০ জন। ২০২১ সাল থেকে দেশে আসা মরদেহ বাড়তে থাকে।
প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী জানিয়েছেন, মৃত প্রবাসীদের মরদেহ দ্রুত দেশে আনা এবং অনিয়মিত কর্মীদের সহায়তা প্রদানে সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে। বিদেশে মৃত্যুর কারণ যথাযথভাবে খতিয়ে দেখার বিষয়েও কাজ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তিনি। বর্তমানে বিদেশগামী কর্মীদের বিএমইটি থেকে মাত্র তিন দিনের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়, যা যথেষ্ট নয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। কর্মীদের কাজের পরিবেশ ও নিরাপত্তা ঝুঁকি মোকাবিলার কৌশল নিয়ে আরও বিস্তৃত প্রশিক্ষণের প্রয়োজনীয়তার কথা বলছেন তারা। এটি জানতে পেরে তিনি প্রবাসীদের মাধ্যমে দেশটির স্থানীয় পুলিশের নম্বর সংগ্রহ করে কল্যাণ বোর্ডকে সহায়তা করেন।
কল্যাণ বোর্ডের নিয়ম অনুযায়ী, বিএমইটির ছাড়পত্র নিয়ে বা দূতাবাস থেকে নিবন্ধিত হয়ে বিদেশে গেলে মরদেহ আনার খরচ বোর্ড বহন করে। নিবন্ধিত না হলেও আবেদনের প্রেক্ষিতে মন্ত্রণালয় মরদেহ আনার খরচ দিয়ে থাকে। প্রতিটি মরদেহের দাফন বাবদ ৩৫ হাজার টাকা এবং পরবর্তী সময়ে ৩ লাখ টাকা আর্থিক অনুদান দেওয়া হয়। এ বছরের প্রথম ৬ মাসে দাফন সহায়তা বাবদ ৯ কোটি ৪৫ লাখ টাকা এবং অনুদান বাবদ ৬১ কোটি ৫৬ লাখ টাকা বিতরণ করা হয়েছে। এছাড়া ক্ষতিপূরণ ও বিমা বাবদ প্রায় ৭৫ কোটি টাকা আদায় করে দেওয়া হয়েছে কর্মীদের পরিবারকে।
তবে এই সুবিধা প্রাপ্তি নিয়ে নানা অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের মতে, আবেদন করার পর কল্যাণ বোর্ডের দপ্তরে মাসের পর মাস ঘুরতে হয়। বিশেষ করে যাঁরা বিদেশ থেকে সব হারিয়ে শূন্য হাতে ফেরেন বা অনিয়মিত কর্মী হিসেবে কাজ করেন, তাঁরা সরকারি সহায়তা পাওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি বঞ্চনার শিকার হন। ব্র্যাক অভিবাসন কর্মসূচির প্রধান শরিফুল হাসান মনে করেন, তরুণ বয়সী কর্মীদের মৃত্যুর এই প্রবণতা ভয়াবহ। প্রতিটি মৃত্যুর কারণ নিরপেক্ষভাবে খতিয়ে দেখা জরুরি, যাতে ভবিষ্যতে মৃত্যুহার কমানোর কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া যায়। তিনি জোর দিয়ে বলেন, মরদেহ দেশে আনার ক্ষেত্রে কোনোভাবেই কালক্ষেপণ গ্রহণযোগ্য নয়; অনিয়মিত কর্মী হলেও রাষ্ট্রকে তাঁর মরদেহ আনার দায়িত্ব নিতে হবে।