জার্মানির রাজধানী বার্লিনে তিন দিনব্যাপী শুরু হয়েছে ‘ওয়াল্ড হেলথ সামিট ২০২৬’। ‘সংকট থেকে স্থিতিস্থাপকতা: স্বাস্থ্যের জন্য উদ্ভাবন’ প্রতিপাদ্যে আয়োজিত এই গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক সম্মেলনে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের যোগ দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু আয়োজকদের পক্ষ থেকে নিশ্চিত করা হয়েছে যে, শেষ মুহূর্তে তিনি সম্মেলনে আর অংশ নিচ্ছেন না। সম্মেলনের যোগাযোগ ও প্রেস বিষয়ক পরিচালক আনা স্টর্মার জানিয়েছেন, স্বাস্থ্যগত কারণেই তিনি এই সফর বাতিল করেছেন। জার্মানির রাজধানী বার্লিনে তিন দিনের বিশ্ব স্বাস্থ্য সম্মেলন শুরু হয়েছে আজ ১১ রোববার।
অন্যদিকে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সহধর্মিণী ডা. জোবাইদা রহমান এই সম্মেলনে অংশ নিচ্ছেন। পেশাগতভাবে চিকিৎসক এবং জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালনরত ডা. জোবাইদা রহমান জনস্বাস্থ্য সংস্কার ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণের কাজে সক্রিয় রয়েছেন। এবারের সম্মেলনে বিশ্বজুড়ে স্বাস্থ্যব্যবস্থার সংকট, ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ এবং বিজ্ঞান ও অর্থনীতির মেলবন্ধনে সমাধানের উপায় নিয়ে নীতিনির্ধারক, চিকিৎসা বিজ্ঞানী ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা আলোচনা করছেন। বিজ্ঞান, রাজনীতি, অর্থনীতি ও নাগরিক সমাজের মধ্যে সংলাপ এবং সহযোগিতার মাধ্যমে বৈশ্বিক স্বাস্থ্য সমস্যার সমাধান খোঁজাই এর মূল লক্ষ্য।
ড. ইউনূসের সফর বাতিলের সিদ্ধান্তের পেছনে আন্তর্জাতিক মহলের চাপের একটি যোগসূত্র রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সম্মেলনের তিন সপ্তাহ আগে ইউরোপের পাঁচটি আন্তর্জাতিক সংগঠন বাংলাদেশের হাম পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তাঁর অংশগ্রহণ পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছিল। তারা একটি পিটিশন দাখিল করেছিল, যেখানে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২৩ এপ্রিলের প্রতিবেদনের প্রসঙ্গ আনা হয়। ওই প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৫ মার্চ থেকে ১৪ এপ্রিলের মধ্যে বাংলাদেশে ১৯ হাজার ১৬১ জন হামের সন্দেহভাজন রোগী শনাক্ত হয়েছিল এবং ১৬৬ জনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গিয়েছিল। আক্রান্তদের ৭৯ শতাংশই ছিল পাঁচ বছরের নিচে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২৩ এপ্রিলের প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৫ মার্চ থেকে ১৪ এপ্রিলের মধ্যে বাংলাদেশে ১৯ হাজার ১৬১ জন সন্দেহভাজন হাম রোগী এবং ২ হাজার ৯৭৩টি পরীক্ষাগারে নিশ্চিত হাম সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছিল। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা একই সঙ্গে বাংলাদেশে চলমান সংক্রমণ, বিপুলসংখ্যক টিকাবিহীন বা টিকা-ঘাটতিসম্পন্ন শিশু এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার ঘাটতির কারণে জাতীয় পর্যায়ে ঝুঁকিকে ‘উচ্চ’ বলে মূল্যায়ন করেছিল। পিটিশনকারীদের বক্তব্য, নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে বিঘ্ন, টিকার প্রাপ্যতা ও সরবরাহ, সংগ্রহ ও ব্যবস্থাপনা এবং জরুরি টিকাদান কার্যক্রম নিয়ে যে প্রশ্নগুলো বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, সেগুলোর স্বাধীনভাবে পর্যালোচনা প্রয়োজন। এই প্রেক্ষাপটে সংগঠনগুলো ওয়ার্ল্ড হেলথ সামিটের আয়োজকদের কাছে কয়েকটি পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছে।
উদ্বেগ প্রকাশকারী সংগঠনগুলোর মধ্যে রয়েছে সাউথ এশিয়া ডেমোক্রেটিক ফোরাম, ইউরোপিয়ান বাংলাদেশ ফোরাম, ওয়ার্কিং গ্রুপ বাংলাদেশ ইন জার্মানি, আর্থ সিভিলাইজেশন নেটওয়ার্ক এবং ফ্রিডম অ্যান্ড জাস্টিস অ্যালায়েন্স। তাদের দাবি ছিল, বাংলাদেশের টিকাদান কর্মসূচি ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিয়ে যে প্রশ্ন উঠেছে, তাতে প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে ড. ইউনূস দায় এড়াতে পারেন না। তাদের পক্ষ থেকে আয়োজকদের অনুরোধ করা হয়েছিল যেন তাঁকে বিশেষ বক্তা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা হয় অথবা হাম প্রাদুর্ভাব নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলার সুযোগ দেওয়া হয়। তাদের মতে, এসব প্রশ্ন শুধু একটি নির্দিষ্ট রোগের প্রাদুর্ভাবের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়; বরং একটি দেশের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার সক্ষমতা, সংকট মোকাবিলার প্রস্তুতি, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতার সঙ্গেও সম্পর্কিত।
সংগঠনগুলোর স্মারকলিপি ও পিটিশনের পাশাপাশি, সম্মেলনের বাইরে জার্মান আওয়ামী লীগ ও প্রবাসী বাংলাদেশিদের পক্ষ থেকে ৪০০ বিক্ষোভকারীর অংশগ্রহণের জন্য পুলিশি অনুমতির বিষয়টিও সামনে এসেছিল। শনিবার বার্লিন পুলিশ কর্তৃপক্ষ বিক্ষোভের অন্যতম আয়োজক মিজানুর হক খানকে ড. ইউনূসের সম্মেলনে না আসার বিষয়টি নিশ্চিত করে। মূলত সম্মেলনের শুরু থেকেই তাঁর অংশগ্রহণকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন পক্ষের সরব অবস্থান ছিল আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।
উল্লেখ্য যে, ২০০৯ সালে বার্লিনের শারিতে বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালের ৩০০ বছর পূর্তি উপলক্ষে এই সম্মেলনের যাত্রা শুরু হয়েছিল। সেই বছর ১৪ থেকে ১৯ অক্টোবর ‘চিকিৎসাবিজ্ঞানের বিবর্তন’ প্রতিপাদ্যে প্রথম সম্মেলন আয়োজিত হয়। বর্তমানে এটি বিশ্ব স্বাস্থ্য নিয়ে মতবিনিময় ও সহযোগিতার অন্যতম প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করছে, যা বিজ্ঞান ও নীতি-নির্ধারণী মহলের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করে। মঙ্গলবার পর্যন্ত চলমান এই আসরে বাংলাদেশ থেকে অংশগ্রহণকারীদের দুটি অধিবেশনে বক্তব্য রাখার সূচি ছিল।