বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:০৯ পূর্বাহ্ন

২৬ অক্টোবর ৪ দিনের সফরে জাপান যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক

প্রতিবেদকের নাম

বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও গভীর করা, বাণিজ্য সম্প্রসারণ, নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং উন্নয়ন সহায়তা বৃদ্ধির লক্ষ্যে আগামী ২৬ অক্টোবর চার দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে জাপান যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এই সফরকে কেন্দ্র করে উভয় দেশের অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সহযোগিতা নতুন মাত্রায় পৌঁছাবে বলে আশা করা হচ্ছে। আগামী ২৭ অক্টোবর জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে বসবেন প্রধানমন্ত্রী। সফরকালে জাইকার প্রেসিডেন্ট এবং জাপান-বাংলাদেশ ইকোনমিক ফোরামেও তার অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে।

মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম প্রধানমন্ত্রীর এই সফরসূচি নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, এ সফরের মাধ্যমে বাংলাদেশ ও জাপানের বিদ্যমান সম্পর্ক আরও জোরদার ও সময়োপযোগী করার পথ সুগম হবে। দ্বিপক্ষীয় আলোচনার পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানি, কৃষি প্রযুক্তি এবং দক্ষ মানবসম্পদ রফতানির মতো সম্ভাবনাময় খাতে পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়াতে জোর দেওয়া হচ্ছে।

এর আগে ১০ অক্টোবর পররাষ্ট্র বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির জানান, প্রধানমন্ত্রীর এই সফরে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যিক সম্পর্ক গতিশীল করা, অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব সুদৃঢ় করা এবং জাপানি বিনিয়োগ বৃদ্ধিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন অংশীদারত্বে বাংলাদেশ বিশেষ নজর দিচ্ছে। দ্বিপক্ষীয় এই সহযোগিতার অন্যতম লক্ষ্য ২০২৬-৩১ মেয়াদের জন্য প্রস্তাবিত ১৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সহায়তা প্যাকেজ উপস্থাপন করা। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দুই দেশের আলোচনায় রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান, শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক বিনিময় এবং বহুপক্ষীয় ফোরামে সহযোগিতার বিষয়ও গুরুত্ব পেয়েছে।

প্রস্তাবিত এই ১৪ বিলিয়ন ডলারের প্যাকেজে ১২টি অগ্রাধিকারমূলক খাত নির্ধারণ করা হয়েছে, যার মধ্যে বেশ কয়েকটি বে অব বেঙ্গল ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রোথ বেল্ট (বিগ-বি) কাঠামোর আওতাভুক্ত। এতে পরিবহন ও নগর যোগাযোগের জন্য ৩.৪৫ বিলিয়ন ডলার, সমন্বিত শিল্প, বন্দর ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র গড়ে তুলতে এমআইডিআই এবং মাতারবাড়ী হাবের জন্য ৩.১৪ বিলিয়ন ডলার, উৎপাদন, সেমিকন্ডাক্টর ও অটোমোবাইল খাতে ১.৫৭ বিলিয়ন ডলার, জ্বালানি ও জলবায়ু সহনশীলতায় ২.২২ বিলিয়ন ডলার এবং কৃষি, ব্লু ইকোনমি ও পর্যটনে ১.২২ বিলিয়ন ডলার বরাদ্দের প্রস্তাব রাখা হয়েছে।

জাপান দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের বড় বড় ভৌত অবকাঠামো নির্মাণে প্রধান সহযোগী হিসেবে কাজ করছে। ঢাকার মেট্রোরেল, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল এবং মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর ও বিদ্যুৎ প্রকল্পের মতো মেগা প্রকল্পগুলোতে জাপানি অর্থায়ন ও কারিগরি সহায়তা অন্যতম। এসব প্রকল্প দুই দেশের সম্পর্কের গভীরতা প্রমাণ করে। দেশটি বাংলাদেশের বিভিন্ন বড় অবকাঠামো প্রকল্পে সহায়তা দিয়ে আসছে।

গত ১২ আগস্ট ঢাকায় অনুষ্ঠিত সপ্তম বাংলাদেশ-জাপান পররাষ্ট্র দফতর পর্যায়ের বৈঠকে কূটনৈতিক আলোচনার অগ্রগতি ঘটে। সেখানে বাণিজ্য, অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ), প্রতিরক্ষা সহযোগিতা ও সবুজ জ্বালানি নিয়ে কথা হয়। ওই বৈঠকে জাপানের জ্যেষ্ঠ উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিরোয়ুকি নামাজু জাপানের প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে সফরের আনুষ্ঠানিক নিমন্ত্রণ জানান। একইভাবে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকেও জাপানি প্রধানমন্ত্রীকে ঢাকা সফরের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল।

আসন্ন সফরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয় শ্রমবাজার। বয়স্ক জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে জাপানে কর্মীদের চাহিদা বাড়ছে, যা কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ প্রতিবছর প্রায় ১ লাখ দক্ষ কর্মী ও শিক্ষার্থী পাঠাতে আগ্রহী। বিশেষ করে একটি নতুন সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) চূড়ান্ত হলে সফরে তা স্বাক্ষরিত হতে পারে। এর আগে ২০২৫ সালের মে মাসে দক্ষ জনশক্তি গড়ার বিষয়ে দুটি সমঝোতা স্মারক সই হয়েছিল। তবে এবার নতুন চুক্তির বিষয়টি এখনও আনুষ্ঠানিক ঘোষণার অপেক্ষায় রয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ২০২৬ সালের আগস্টের বিবৃতিতে জাপানে বাংলাদেশি বিশেষায়িত দক্ষ শ্রমিক বা নির্দিষ্ট দক্ষতাসম্পন্ন কর্মীদের সুযোগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তাই বিষয়টি সম্ভাব্য আলোচ্যসূচি হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে। পাশাপাশি শিক্ষা, সংস্কৃতি ও নাগরিক পর্যায়ের বিনিময় বাড়ানোর কথাও বলা হয়েছে। এই সফরে জনশক্তি রফতানি বিষয়ে একটি সমঝোতা স্মারক সইয়ের প্রস্তুতি চলছে।

প্রাক্তন রাষ্ট্রদূত মাহফুজুর রহমান প্রধানমন্ত্রীর সফর প্রসঙ্গে উল্লেখ করেন, জাপান বাংলাদেশের একজন পরীক্ষিত বন্ধু। দেশে যেন জাপানের বিনিয়োগ আরও বৃদ্ধি পায়, সেদিকে জোর দেওয়া দরকার। একই সঙ্গে তিনি জানান, আগে বাংলাদেশকে দেওয়া জাপানের অনুদানের পরিমাণ কিছুটা কমেছে, যা সফরকালে আলোচনার মাধ্যমে আগের ধারায় ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা যেতে পারে। প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফরে বাংলাদেশে যেন জাপানের বিনিয়োগ আরও বাড়ে, সেই বিষয়টি প্রাধান্য পাবে বলে প্রত্যাশা করি। তবে জাপানের অনুদান আগের চেয়ে কমে গেছে।

দুই দেশের এ যৌথ প্রয়াসের পটভূমিতে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের ২০২৫ সালের ২৮-৩১ মে অনুষ্ঠিত জাপান সফরও উল্লেখযোগ্য। ৩০ মে তৎকালীন জাপানি প্রধানমন্ত্রী শিগেরু ইশিবার সঙ্গে তার বৈঠকে জলবায়ু সহনশীলতা ও অর্থনৈতিক সংস্কারে ৬০ বিলিয়ন ইয়েন ঋণচুক্তি সই হয়েছিল, যা দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী ভিত প্রদান করে। ৩০ মে টোকিওতে জাপানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শিগেরু ইশিবার সঙ্গে তার শীর্ষ বৈঠক হয়। সেই সময় অর্থনৈতিক সংস্কার বাস্তবায়ন এবং জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলায় বাংলাদেশের সক্ষমতা বাড়াতে জাপানের সঙ্গে ৬০ বিলিয়ন ইয়েন ঋণচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


আমাদের ফেসবুক পেইজ