রাজধানীর তুরাগ নদ থেকে বিমানবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা কে এম তাহসিফ সৌরির (২৮) মরদেহ উদ্ধার ঘিরে নানা প্রশ্ন ও রহস্য দানা বেঁধেছে।
নিখোঁজের একদিন পর বুধবার বিকেলে নৌ পুলিশ তার মরদেহ উদ্ধার করে। ইতিমধ্যে তার মরদেহের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়েছে। নিখোঁজের দিন সন্ধ্যায় বাসা থেকে বের হয়েছিলেন তাহসিফ। তার বাবার ভাষ্যমতে, পরিবারকে কোনো কিছু না বলেই তিনি বাসা থেকে বের হয়েছিলেন। তবে যেখানে তার মরদেহ মিলেছে, সেই রাজাবাড়ী ঘাট এলাকায় তাহসিফ কখনো যাননি বলেই স্বজনরা নিশ্চিত করেছেন। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে, তিনি কীভাবে সেই অপরিচিত স্থানে গেলেন এবং তাকে সেখানে কে ডেকে নিয়েছিল? রাত দেড়টা পর্যন্ত তিনি কোথায় ছিলেন, শেষ মেসেজ কে দিয়েছিল এবং কোন বিষয় নিয়ে তিনি আতঙ্কিত ছিলেন—এমন নানা অমিমাংসিত তথ্য এখন সামনে আসছে। গণঅভ্যুত্থানের পর চাকরি থেকে অব্যাহতি নেওয়া তাহসিফকে ঘিরে নানা আলোচনা চলমান। বিশেষ করে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উড়োজাহাজে করে ভারতে পালানোর ভিডিও প্রচারের সঙ্গে তার মৃত্যুর যোগসূত্র আছে কি না, তা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন উঠেছে। তবে এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এখনই কোনো মন্তব্য করতে রাজি নন। কে তাকে ডেকে নিল এমন প্রশ্নও ঘুরপাক খাচ্ছে।
অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার দেশত্যাগের ভিডিও তাহসিফ ধারণ করেছিলেন বা ছড়িয়ে দিয়েছিলেন, এমন আলোচনা আগে থেকেই ছিল। মৃত্যুর বেশ কয়েকদিন আগে প্রকাশিত একটি পডকাস্টে তাহসিফ নিজেই অভিযোগটিকে ‘প্রমাণহীন অভিযোগ’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। বিমানবাহিনী থেকে অব্যাহতি পাওয়ার সঙ্গে এই রাজনৈতিক অভিযোগের কোনো সম্পর্ক ছিল কি না, জানতে চাইলে তিনি সেই পডকাস্টে ইশারা দিয়েছিলেন যে এমনটি হওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তবে তিনি নিরাপত্তার খাতিরে সবকিছু খোলাসা করতে অপারগতা প্রকাশ করেন।
নিজেদের তাহসিফের বন্ধু দাবি করা বাংলাদেশ নৌবাহিনীতে কর্মরত কে এস এম ইনতিসার ইনজামামও নিজের ফেসবুকে একটি বিশ্লেষণমূলক পোস্ট দিয়েছেন। তিনি শেখ হাসিনার হেলিকপ্টারে দেশত্যাগের ভিডিও ফাঁসের ঘটনার সঙ্গে তাহসিফের অকাল মৃত্যুর যোগসূত্র থাকতে পারে বলে গভীর সন্দেহ প্রকাশ করেন। ইনতিসার লেখেন, গত পরশু রাতে সে বাইরে যায় এবং এরপরই এই মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে। তিনি আরো উল্লেখ করেন, তার লাশের ছবিতে হাতে কাদা মাখা দেখা গেলেও শরীরের বাকি সব পরিষ্কার। এই বিষয়গুলো কিসের লক্ষণ তা এখনই মন্তব্য না করলেও, তিনি ইঙ্গিত দেন যে এটি ব্যক্তিগত কোনো কোন্দল বা নিছক দুর্ঘটনা না হলে তিনি এটিকে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড হিসেবেই দেখবেন। ৫ই আগস্টের ভিডিও ফাঁস হওয়ার পর তাহসিফের মানহানি করার নানা চেষ্টা করা হলেও তার বিরুদ্ধে কোনো পুলিশি মামলা করা সম্ভব হয়নি বলে পোস্টে দাবি করা হয়। বাকি সব ক্লিন, এইটা কিসের লক্ষণ আমি এখনি বলতে চাইনা।
মরদেহ উদ্ধারের বিষয়ে নৌ পুলিশের অভ্যন্তরীণ প্রতিবেদনে বলা হয়, বুধবার বিকাল সাড়ে ৪টার সময় ৯৯৯-এর মাধ্যমে খবর পাওয়া যায় উত্তরখান থানার রাজাবাড়ী ঘাট সংলগ্ন তুরাগ নদীতে অজ্ঞাতনামা এক ব্যক্তির মরদেহ ভাসছে। যার বয়স আনুমানিক ২৮ বছর। নিহতের পরনে সাদা পাজামা ও কালো জামা ছিল। হাতে ঘড়ি ও পকেটে থাকা আইফোনের মাধ্যমে বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সৌরির লাশ হিসেবে তার পরিচয় শনাক্ত করা হয়। মুখে হালকা দাড়ি ছিল। নৌ পুলিশের ঢাকা অঞ্চলের পুলিশ সুপার আব্দুল্লাহ আল মামুন জানান, খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছায় এবং তুরাগ নদী থেকে মরদেহ উদ্ধার করে। পরে তার আত্মীয়কে খবর দেওয়া হলে সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহ পাঠানো হয়। এই পুরো ঘটনার নেপথ্যে থাকা প্রকৃত সত্য উদঘাটনের দাবি উঠেছে সর্বমহল থেকে। নিখোঁজ হওয়ার পর থেকে মৃত্যুর আগের মুহূর্ত পর্যন্ত তার গতিবিধি ও যোগাযোগের মাধ্যমগুলো এখন তদন্তের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। স্বজনরা ন্যায়বিচারের আশায় এখন আইনশৃ্খলা বাহিনীর রিপোর্টের অপেক্ষায় রয়েছেন। বিকাল সাড়ে ৪ টার দিকে তুরাগ নদী থেকে একজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।