জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং শিক্ষার্থীদের নানা দাবির প্রেক্ষিতে ফ্রান্সে আবারও বড় ধরনের বিক্ষোভ কর্মসূচি পালিত হয়েছে। শনিবার (৭ নভেম্বর) প্যারিসসহ ফ্রান্সের বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের দফায় দফায় সংঘর্ষ ও উত্তেজনার ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সারা দেশে ৭০ হাজার পুলিশ ও জেন্ডারমারি সদস্য মোতায়েন করা হয়েছিল। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সন্ধ্যা ৭টার তথ্য অনুযায়ী, দিনব্যাপী বিক্ষোভ ঘিরে অন্তত ৩৬০ জনকে আটক করা হয়েছে।
মন্ত্রণালয়ের দেওয়া তথ্যানুযায়ী, শনিবার সারা দেশে ১৪১টি পৃথক কর্মসূচিতে মোট ১ লাখ ৪৬ হাজার মানুষ অংশ নেন। এর মধ্যে শুধু রাজধানী প্যারিসেই বিক্ষোভকারীর সংখ্যা ছিল ৪৬ হাজার। তবে আয়োজক শিক্ষার্থী জোটের দাবি অনুযায়ী, সারা দেশে আড়াই লাখ এবং প্যারিসে প্রায় ৭৫ হাজার মানুষ রাজপথে নেমেছিলেন। প্যারিসের প্লাস দ্য লা রিপাবলিক থেকে প্লাস দ্য লা নাসিওঁ পর্যন্ত মিছিলটি শুরুতে শান্ত থাকলেও শেষ পর্যায়ে নাসিওঁ চত্বরে পরিস্থিতির অবনতি ঘটে। বিক্ষোভকারীরা পুলিশের দিকে বিভিন্ন বস্তু ও আতশবাজি ছুড়লে নিরাপত্তা বাহিনী কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করে। পুলিশের ভাষ্যমতে, ময়লার কন্টেইনারে আগুন দেওয়ার সময় এক ব্যক্তিকে আটকের সময় প্রায় ২০০ জনের একটি সহিংস গোষ্ঠী পুলিশকে লক্ষ্য করে হামলা চালায়। অন্যদিকে, শিক্ষার্থী ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের সংগঠনগুলোর সমন্বয়ে গঠিত আন্দোলনকারীদের জোটের দাবি, সারা দেশে ২ লাখ ৫০ হাজার এবং প্যারিসে ৭৫ হাজার মানুষ বিক্ষোভে অংশ নিয়েছেন।
বিক্ষোভ চলাকালীন প্যারিসের প্লাস দ্য লা কনকর্দ এলাকায় ইয়েলো ভেস্ট আন্দোলনের একটি অংশ নিষিদ্ধ সমাবেশের চেষ্টা করলে পুলিশ তাদের ঘিরে ফেলে। এ সময় আন্দোলনের সমন্বয়ক বেঞ্জামিন বল এবং মুখপাত্র আজেলমা সিগোকে আটক করা হয়েছে। এছাড়া দেশটির দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর লিয়োঁতেও অনুমতিহীন সমাবেশ থেকে রাস্তা অবরোধের চেষ্টা করা হলে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করে জনতাকে সরিয়ে দেয়। তুলুজ, গ্রেনোবল, মার্সেই, নঁত, বোর্দো, স্ত্রাসবুর্গ ও দিজোঁর মতো বড় শহরগুলোতেও উত্তেজনা এবং নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘাতের খবর পাওয়া গেছে। শান্তি বজায় রাখতে নিরাপত্তা বাহিনীর সহায়তায় ২৫টি সাঁজোয়া যান ও ১৫টি জলকামান প্রস্তুত রাখা হয়েছিল। এছাড়া রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় প্রায় ৪০ হাজার মানুষকে তল্লাশির আওতায় আনা হয়। সেখানে জড়ো হওয়া ব্যক্তিদের পুলিশ ঘিরে ফেলে।
গত কয়েক সপ্তাহের তুলনায় শনিবারের বিক্ষোভের অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা কিছুটা কম ছিল। এর আগে ১৭ অক্টোবর ৫ লাখ ৫০ হাজার, ২৪ অক্টোবর ৪ লাখ ১০ হাজার এবং ৩১ অক্টোবর ৩ লাখ ২০ হাজার মানুষ বিক্ষোভে অংশ নিয়েছিলেন। ৫ নভেম্বর শ্রমিক সংগঠনগুলোর ডাকা জাতীয় কর্মসূচিতে সরকারি হিসেবে ৫ লাখ ৭৫ হাজার এবং আয়োজকদের দাবি অনুযায়ী ১৬ লাখ মানুষের সমাগম হয়েছিল।
উল্লেখ্য, সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো ও শিক্ষকস্বল্পতা নিয়ে উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষার্থীদের আন্দোলন থেকেই বর্তমান এই বিক্ষোভের সূত্রপাত। সময়ের সাথে সাথে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী ও বিভিন্ন পেশার মানুষ এতে যুক্ত হয়। জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো, বেতন বাড়ানো এবং শিক্ষায় বিনিয়োগ বাড়ানোর দাবিগুলো এখন এই আন্দোলনের প্রধান এজেন্ডা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা কিছুটা কমলেও ফ্রান্সের বড় শহরগুলোতে ছড়িয়ে পড়া এই অস্থিরতা দেশটিতে চলমান সামাজিক অসন্তোষের গভীরতাকে স্পষ্ট করেছে। পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও বিভিন্ন পেশার মানুষের অংশগ্রহণে তা দেশব্যাপী আন্দোলনে রূপ নেয়।