ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লির যন্তর মন্তরে ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) ডাকা বিক্ষোভ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে কেন্দ্রীয় সরকার ও পুলিশ প্রশাসন ব্যাপক কড়াকড়ি আরোপ করেছে। বিক্ষোভের ছয় দিন আগে থেকেই শুরু হয় এই প্রস্তুতির প্রক্রিয়া। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের তথ্য অনুযায়ী, গত ৪ অক্টোবর কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রসচিব একাধিক রাজ্যের পুলিশপ্রধান (ডিজিপি) ও বাছাই করা কমিশনারদের নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক করেন। কেন্দ্রীয় সরকার ও পুলিশের বিভিন্ন সূত্র থেকে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস এমন তথ্য জানতে পেরেছে।
সেই বৈঠকে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রসচিব স্পষ্ট নির্দেশ দেন, অতীতে যারা এই ধরনের আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন, তাঁদের যেন নিজ শহর থেকে দিল্লির উদ্দেশে রওনা হতে দেওয়া না হয়। পরিস্থিতির ওপর নজরদারি এবং প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা হিসেবে আন্দোলনের আর্থিক উৎস খুঁজে বের করার ওপরও জোর দেওয়া হয়। এরপর ৮ অক্টোবর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দ্বিতীয় দফায় বৈঠক করে প্রস্তুতির অগ্রগতি যাচাই করে নেয়। পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার প্রস্তুত রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ৮ অক্টোবর দ্বিতীয় দফায় বৈঠক করে।
নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর এই কঠোর অবস্থানের পেছনে মূল কারণ হলো জুলাইয়ের বিক্ষোভ। আগেরবার ধারণা করা হয়েছিল মানুষ কম জড়ো হবে, কিন্তু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছিল। ওই আন্দোলনের জেরেই শেষ পর্যন্ত ভারতের তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। এবার দিল্লি পুলিশ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে সতর্ক করে জানিয়েছে, বিপুল মানুষের জমায়েত সামলানো যেকোনো মূল্যে রুখতে হবে। দিল্লিতে কড়া নিরাপত্তা, বিক্ষোভ ঘিরে কী কী বন্ধ, কী কী খোলা। একটি সূত্র বলেছে, ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের কারণ হয়ে দাঁড়ানো দিল্লির আগের বিক্ষোভগুলোকে তেমন গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। এ কারণেই সেখানে বিপুলসংখ্যক মানুষ জড়ো হতে পেরেছিলেন। এ ক্ষেত্রে মহারাষ্ট্রকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
মহারাষ্ট্রের দিকে বিশেষভাবে নজর দেওয়া হয়েছে, কারণ সিজেপি নেতা অভিজিৎ দিপকের নিজ রাজ্য হওয়ায় সেখান থেকে বড় জমায়েতের আশঙ্কা ছিল। মহারাষ্ট্রের পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইনশৃঙ্খলা) লক্ষ্মী গৌতমের স্বাক্ষরিত একটি গোপন চিঠির ভিত্তিতে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে নোটিশ জারি করা হয়। চিঠিতে বলা হয়, ১০ অক্টোবরের বিক্ষোভে যোগ দিতে ইচ্ছুক ব্যক্তিদের যেভাবেই হোক বিরত রাখতে হবে এবং প্রয়োজনীয় সতর্কতামূলক পদক্ষেপ নিতে হবে। সিজেপির নেতা অভিজিৎ দিপকের নিজ রাজ্য মহারাষ্ট্রে ওই বৈঠকের দিনই ডিজিপির কার্যালয় থেকে রাজ্যের সব পুলিশ ইউনিটে একটি ‘গোপনীয় চিঠি’ পাঠানো হয়।
এই নির্দেশের পর ৪ অক্টোবর থেকেই সম্ভাব্য আন্দোলনকারীদের ওপর নজরদারি শুরু হয়। যদিও মহারাষ্ট্র পুলিশের এক কর্মকর্তা দাবি করেছেন, ৫০টির কম নোটিশ দেওয়া হয়েছে এবং কাউকে আটক করা হয়নি, কিন্তু মুম্বাই পুলিশের পদক্ষেপ ছিল ভিন্ন। তারা কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করে শুক্রবার মুম্বাইয়ের বিভিন্ন এলাকা থেকে ২০০ জনেরও বেশি ব্যক্তিকে আটক করেছে। পুলিশ জানিয়েছে, শনিবারের বিক্ষোভে যেন তাঁরা অংশ নিতে না পারেন, সে জন্যই এই আটক করা হয়েছে।
আটকদের বিরুদ্ধে মহারাষ্ট্র পুলিশ আইনের বিভিন্ন ধারা প্রয়োগ করা হয়েছে। এদিকে সিজেপি নেতা অভিজিৎ দিপকে এই ধরপাকড়ের সমালোচনা করে গত ৫ অক্টোবর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, মহারাষ্ট্র পুলিশও নিখুঁত নয়। পরদিন তিনি রাজ্যটিতে নেতাকর্মীদের নোটিশ পাওয়ার ঘটনা নিয়ে সংবাদ সম্মেলন করেন। গোয়েন্দা সংস্থাগুলো আগে থেকেই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে নিয়মিত আপডেট দিচ্ছিল, যাতে কোনো ব্যক্তি পুলিশের নজর এড়িয়ে দিল্লি পৌঁছাতে না পারেন। সেই সমন্বয় থেকেই দেশজুড়ে এই দমনমূলক প্রক্রিয়া চালানো হচ্ছে।