আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) ওপর নতুন করে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন। দক্ষিণ আফ্রিকার প্রখ্যাত আইনবিদ ও আইসিসির সাবেক বিচারক নাভি পিল্লাই শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পাওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই শুক্রবার (৯ অক্টোবর) ওয়াশিংটন এই কঠোর সিদ্ধান্ত নেয়। এই পদক্ষেপে বিশ্বজুড়ে আইনের শাসন এবং আন্তর্জাতিক আইনি ব্যবস্থার ওপর বড় ধরনের আঘাত আসার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইউরোপীয় মিত্রদের কূটনৈতিক টানাপোড়েন আরও স্পষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এর ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রগুলোর ওপর।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এই নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি নিশ্চিত করে জানিয়েছেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কোনো মার্কিনিকে বিচারের আওতায় আনার সুযোগ আইসিসিকে দেবেন না। নতুন এই পদক্ষেপের মাধ্যমে আদালতটির সঙ্গে সব ধরনের লেনদেন নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং তাদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। নিষেধাজ্ঞার আওতায় কেবল আইসিসি নয়, বরং আদালতকে সেবা প্রদানকারী বিভিন্ন কোম্পানিও শাস্তির ঝুঁকিতে পড়েছে। যদিও মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ টেলিযোগাযোগ, সফটওয়্যার ও পেনশনের মতো জরুরি কিছু ক্ষেত্রে ছয় মাসের ছাড় দিয়েছে। তাঁর ভাষ্য, আইসিসির সঙ্গে লেনদেন নিষিদ্ধ করা, এর সম্পদ ও অর্থপ্রাপ্তির পথ বন্ধ করা এবং কার্যক্রম পরিচালনার সক্ষমতা সীমিত করাই এ পদক্ষেপের লক্ষ্য। এর ফলে টেলিযোগাযোগ, সফটওয়্যার, পেনশন প্রদান এবং বন্দিদের সঙ্গে সম্পর্কিত কিছু লেনদেন চালু রাখা সম্ভব হবে। রুবিও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগের বিষয়গুলো সমাধানের সুযোগ দিতেই নিষেধাজ্ঞাটি এমনভাবে কার্যকর করা হয়েছে।
নিষেধাজ্ঞার প্রতিক্রিয়ায় আইসিসি এক বিবৃতিতে বলেছে, আদালত একা টিকে থাকতে পারে না এবং তাদের সুরক্ষা দেওয়ার দায়িত্ব ১২৫টি সদস্য রাষ্ট্রের। এটি কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্বের লড়াই নয়, বরং আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার ব্যবস্থার সুরক্ষার বিষয়। ২০০২ সালে যুদ্ধাপরাধ, গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধ বিচারের লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠিত আইসিসির বিরুদ্ধে ট্রাম্প প্রশাসনের এই বিরোধী মনোভাব নতুন নয়। তবে রুবিও হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, আইসিসি যদি তাদের কার্যক্রম না থামায়, তবে যুক্তরাষ্ট্র আদালতটির অস্তিত্ব বিপন্ন করার মতো চূড়ান্ত পদক্ষেপ নিতে পারে। দাবি পূরণ না হলে নিষেধাজ্ঞার শর্ত পরিবর্তন করা হতে পারে।
মার্কিন প্রশাসনের দাবি, রোম স্ট্যাটিউটের সদস্য রাষ্ট্রগুলো যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগ দূর করতে ব্যর্থ হয়েছে। এ কারণে মিত্র দেশগুলোর প্রতি ওয়াশিংটনের আহ্বান, তারা যেন আইসিসির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পদক্ষেপ নেয়। বিশেষ করে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং হামাস নেতাদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির ইস্যুটি ওয়াশিংটন ও হেগের মধ্যকার বিরোধকে তুঙ্গে তুলেছে। এছাড়া আফগানিস্তানে মার্কিন সেনাদের ভূমিকা নিয়ে আদালতের অতীতের তদন্তও এই ক্ষোভের অন্যতম কারণ।
আইসিসির ডেপুটি প্রসিকিউটর নাজহাত শামিম খান জানিয়েছেন, এই নিষেধাজ্ঞা আন্তর্জাতিক আইনের শাসনকে দুর্বল করার একটি কৌশল মাত্র। তবে এর পরেও আদালতের তদন্ত ও বিচারকার্যক্রম কোনোভাবেই থেমে থাকবে না। বর্তমানে আইসিসি রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, সুদান ও লিবিয়ার সাবেক রাষ্ট্রপ্রধানসহ ৭০ জনেরও বেশি ব্যক্তির বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে অভিযোগ এনেছে। নেদারল্যান্ডসে অবস্থিত এই আদালত অতীতে ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ ন্যাটোর বেশিরভাগ সদস্য রাষ্ট্রের সমর্থন পেয়ে এসেছে। তবে তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়া অব্যাহত থাকবে বলে জানান তিনি। আইসিসি বিশ্বনেতা ও বৈশ্বিক সংঘাতের সঙ্গে জড়িত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিসহ ৭০ জনেরও বেশি মানুষের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে অভিযোগ এনেছে। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, সুদানের সাবেক প্রেসিডেন্ট ওমর আল-বশির এবং লিবিয়ার সাবেক নেতা মুয়াম্মার গাদ্দাফি।
নোবেল কমিটি নাভি পিল্লাইকে পুরস্কার প্রদানের সময় স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছে যে, রাজনৈতিক আক্রমণের শিকার হওয়া এই আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালগুলোর প্রতি সমর্থন জানানোর একটি উপায়ই হলো এই স্বীকৃতি। ২০০৩ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত পিল্লাই আইসিসির আপিল বিভাগে কর্মরত ছিলেন। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের মুখোমুখি করা এবং ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা যে শান্তিপূর্ণ বিশ্বের অন্যতম পূর্বশর্ত, নোবেল কমিটি তা মনে করিয়ে দিয়েছে।
ট্রাম্প প্রশাসনের এই নিষেধাজ্ঞার ফলে দেশটিতে থাকা ব্যাংক, বিমা কোম্পানি ও সফটওয়্যার প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য আইসিসির সঙ্গে কাজ করা এখন অত্যন্ত কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। অতীতেও প্রথম মেয়াদে ট্রাম্প প্রশাসন আইসিসির কর্মকর্তাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল, যা প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের আমলে প্রত্যাহার করা হয়েছিল। কিন্তু ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় ফেরার কয়েক দিনের মধ্যেই আবারও একই কঠোর পথ বেছে নিল বর্তমান মার্কিন প্রশাসন।