দেশভাগের সাত দশক পর ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যকার ঐতিহাসিক নৌপথটি পুনরায় সচল হয়েছে। এর অংশ হিসেবে আসামের চা-নগরী ডিব্রুগড় থেকে ৫৪০ টন মিথানল নিয়ে একটি জাহাজ বাংলাদেশে যাত্রা শুরু করেছে। বগীবিল থেকে ‘ডিএলবি পাতকাই’ নামের এই মিথানলবাহী জাহাজটির যাত্রার শুভ উদ্বোধন করেন ভারতের কেন্দ্রীয় নৌপরিবহন ও জলপথমন্ত্রী সর্বানন্দ সনোয়াল। অনুষ্ঠানে ভার্চুয়ালি উপস্থিত ছিলেন আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা। ব্রিটিশ আমলে এই নৌপথটি কলকাতা হয়ে চা, কাঠ ও কয়লা পরিবহনের প্রধান মাধ্যম ছিল। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর এই রুটটি অকার্যকর হয়ে পড়লে ১৯৫৬ সালে ডিব্রুগড়ের ব্রহ্মপুত্র বন্দর বন্ধ করে দেওয়া হয়। সনোয়াল বলেন, ভারতের চা রাজধানী হিসেবে পরিচিত ডিব্রুগড় একসময় যে মহান নদীবন্দর হিসেবে গৌরব অর্জন করেছিল, তা আবার ফিরে পাচ্ছে। কয়েক দশক ধরে যা ছিল না, তা হলো এটিকে পুনরুজ্জীবিত করার ইচ্ছা। বর্তমান বাংলাদেশের সরকারের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের টানাপড়েনের মধ্যেই এই ঘটনাকে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখছেন কর্মকর্তারা।
ডিব্রুগড়ের শৈশবের স্মৃতিচারণ করে মন্ত্রী সর্বানন্দ সনোয়াল বলেন, আমাদের পূর্বসূরিরা ডিব্রুগড় ঘাটে স্টিমারের বাঁশির শব্দ শুনে অভ্যস্ত ছিলেন। ঘাট বন্ধ থাকায় গত ৭০ বছর এই শব্দ স্তব্ধ ছিল। এখন ডিব্রুগড় থেকে আবারও পণ্যবাহী জাহাজ আন্তর্জাতিক গন্তব্যের দিকে যাত্রা করছে। আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা বলেন, এটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ যে আসামের নিজস্ব পণ্য নিজস্ব নদীবক্ষ দিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে যাচ্ছে। বর্তমান সময়ে উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে কেবল সীমান্ত এলাকা হিসেবে নয়, বরং ভারতের পূর্বাঞ্চলের প্রবেশদ্বার হিসেবে গড়ে তোলা হচ্ছে। উত্তর-পূর্বাঞ্চল এখন আর সীমান্তবর্তী অঞ্চল নয়।
কর্মকর্তাদের মতে, ব্রহ্মপুত্র নদকে উত্তর-পূর্ব ভারত থেকে বিদেশি বাজারে পণ্য পরিবহনের একটি কার্যকর বাণিজ্যিক করিডোর হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে এটি একটি পরীক্ষামূলক উদ্যোগ। সম্প্রতি ধুবড়ি ও বগীবিল এলাকায় কাস্টমস ও অভিবাসন সুবিধা চালু হওয়ায় মিথানলের এই চালান পাঠানো সম্ভব হয়েছে। ভবিষ্যতে নিয়মিতভাবে বাংলাদেশে মিথানল পাঠানোর পরিকল্পনা রয়েছে। ডিব্রুগড়ের এই বন্দরের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস রয়েছে; ১৮৫৬ সাল থেকেই কলকাতা থেকে সরকারি স্টিমার এখানে আসা-যাওয়া করত। ১৯১৩ সাল পর্যন্ত নিয়মিত স্টিমার চলাচল করলেও ১৯৫০ সালের ভূমিকম্পের প্রভাবে নদীর তলদেশের গঠন পরিবর্তিত হয় এবং পরবর্তীকালে রেল যোগাযোগ বাড়ায় ১৯৫৬ সালের ১৫ অক্টোবর বন্দরটি স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যায়। ১৯৬৫ সালে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের সময় আন্তঃসীমান্ত নৌ-বাণিজ্য সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। আমরা বিশ্বমানের অবকাঠামো গড়ে তুলছি এবং একই সঙ্গে এর ঐতিহ্যও সংরক্ষণ করছি।
দীর্ঘ বিরতির পর ১৯৭২ সালে দুই দেশ নৌ-বাণিজ্য প্রটোকল স্বাক্ষর করলেও নিয়মিত পণ্য পরিবহন শুরু হতে অনেকটা সময় লেগেছে। ১৯৮৮ সালে সাদিয়া থেকে ধুবড়ি পর্যন্ত ব্রহ্মপুত্রের ৮৯১ কিলোমিটার অংশকে ‘জাতীয় জলপথ-২’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে সিমেন্ট পরিবহনের মধ্য দিয়ে গুয়াহাটির পান্ডু থেকে ধুবড়ি পর্যন্ত নিয়মিত পণ্য পরিবহন শুরু হয়। পরবর্তীতে ২০২২ সালে টাটা স্টিলের বার্জ পান্ডু পর্যন্ত পৌঁছায় এবং ২০২৩ সালে ‘এমভি গঙ্গা বনি’ জাহাজটি বারাণসী থেকে ডিব্রুগড় ভ্রমণ করে। এছাড়া ২০২৩ সালের জুলাইয়ে বগীবিল যাত্রী ও পণ্য টার্মিনালের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়, যা ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে চালু হয়েছে।
সর্বানন্দ সনোয়াল জানান, ভারতের জাতীয় জলপথে পণ্য পরিবহনের পরিমাণ ২০১৩-১৪ অর্থবছরের ১ কোটি ৮০ লাখ টন থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ২১ কোটি ৮০ লাখ টনে পৌঁছেছে। বর্তমানে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জলপথ উন্নয়নে ৭৭ কোটি ডলারেরও বেশি বিনিয়োগ করা হচ্ছে, যার মধ্যে জাতীয় জলপথ-২-এর উন্নয়ন ও পান্ডু বন্দরের আধুনিকায়ন অন্তর্ভুক্ত। তিনি আরও বলেন, নদীপথে পণ্য পরিবহনে জ্বালানি খরচ কম হয় এবং মহাসড়কে ট্রাকের চাপও কমে আসে। বর্তমানে ভারত বাংলাদেশ, নেপাল, ভুটান ও মিয়ানমারের সঙ্গে আঞ্চলিক জলপথ যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে কাজ করছে। এই নৌযাত্রার সাথে ভারতের ইনল্যান্ড ওয়াটারওয়েজ অথরিটি, আসাম পেট্রো-কেমিক্যালস, কোচিন বাঙ্কার্স এবং বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট অংশীদাররা সম্পৃক্ত রয়েছে।