বুধবার, ১৯ অগাস্ট ২০২৬, ০৫:২৩ অপরাহ্ন
শিরোনাম :
ডিজিটাল ইকোসিস্টেমের অপব্যবহার রোধে সচেতনতা ও নীতিমালার ওপর জোর দিলেন তথ্যমন্ত্রী কলকাতায় হোটেলে অগ্নিকাণ্ড: ৫ বাংলাদেশিসহ নিহত ৯ মাদকের ভয়াল ছোবলে নারীরা: বাড়ছে আসক্তি ও উদ্বেগজনক প্রবণতা মাদারীপুরের শিবচরে পরিত্যক্ত স্থান থেকে অজ্ঞাত তরুণীর মৃত অবস্থায় পাওয়ার ঘটনায় মালয়েশিয়ায় ঝুলে থাকা ১১ হাজারেরও বেশি পিআর আবেদন জুনের মধ্যে নিষ্পত্তির ঘোষণা কলকাতায় হোটেলে অগ্নিকাণ্ড: শিশুসহ ৯ বাংলাদেশির মৃত্যু হালাল খাদ্যসংস্কৃতি ও মূল্যবোধ মানবসভ্যতার জন্য বড় সম্পদ: তথ্যমন্ত্রী বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর নিয়ে কার্যত নীরব নয়াদিল্লি নোয়াখালী-৬ আসনের এমপি আবদুল হান্নান মাসউদের পদ শূন্য চেয়ে হাইকোর্টে রিট নিয়ে সংসদ সদস্য মারদিয়া মমতাজের প্রতিক্রিয়া ও লেখকের পাল্টা বক্তব্য

মাদকের ভয়াল ছোবলে নারীরা: বাড়ছে আসক্তি ও উদ্বেগজনক প্রবণতা

প্রতিবেদকের নাম

দেশে দিন দিন নারীদের মধ্যে মাদক গ্রহণের প্রবণতা বাড়ছে। গাঁজা, ইয়াবা ও ই-সিগারেটের পাশাপাশি অনেক তরুণী ঝুঁকছেন মদ্যপানের দিকেও। বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্টদের মতে, অসৎ সঙ্গ, সঙ্গী বা স্বামীর প্ররোচনা, পারিবারিক অশান্তি, হতাশা এবং পাশ্চাত্য সংস্কৃতির প্রভাবে নারীদের একটি অংশ মাদকে জড়িয়ে পড়ছেন। শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে চিকিৎসক, গৃহিণী ও বিভিন্ন পেশার নারীরাও এখন মাদকাসক্তির শিকার হচ্ছেন। অথচ সামাজিক সংকোচ ও চিকিৎসার সীমিত সুযোগের কারণে তাদের বড় একটি অংশ যথাযথ চিকিৎসার আওতায় আসছেন না।

নারকোটিক্সের সাম্প্রতিক এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০২০ থেকে চলতি বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত ৬ বছরে শুধু সরকারি নিরাময়কেন্দ্রে ৩ হাজার ১০৬ জন নারী মাদকাসক্তির চিকিৎসা নিয়েছেন। সাধারণত ছিন্নমূল ও হতদরিদ্র নারীরা সরকারি নিরাময়কেন্দ্রে ভর্তি হলেও উচ্চ ও মধ্যবিত্ত পরিবারের নারীরা বেসরকারি কেন্দ্র বেছে নেন। বেসরকারি সংস্থা আহ্ছানিয়া মিশন রাজধানীর শ্যামলীতে ৪০ শয্যাবিশিষ্ট একটি নারী মাদকাসক্ত নিরাময়কেন্দ্র পরিচালনা করে। বর্তমানে সেখানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ৩১ জন। এদের মধ্যে ২০ জনই ইয়াবা আসক্ত। চিকিৎসাধীনদের মধ্যে ১২ জন বিভিন্ন কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, একজন এমবিবিএস ডিগ্রিধারী চিকিৎসক, চারজন গৃহিণী, দুজন ব্যবসায়ী, একজন বেসরকারি চাকরিজীবী এবং ১১ জন বেকার রয়েছেন।

সম্প্রতি সেখানে গেলে চিকিৎসাধীন ২৮ বছর বয়সি এক তরুণী কাছে তার মাদকে জড়িয়ে পড়ার প্রেক্ষাপট তুলে ধরেন। ধনাঢ্য পরিবারে জন্ম নেওয়া এই তরুণীর দাম্পত্য বিরোধে বাবা-মায়ের বিচ্ছেদের পর মাত্র ১৩ বছর বয়সে বিয়ে হয়। তবে ৩ গুণ বেশি বয়সি স্বামীর সঙ্গে তিনি সেভাবে মানিয়ে উঠতে পারেননি। জীবনের প্রতি হতাশা থেকে তিনি ধীরে ধীরে মাদকের দিকে হাত বাড়ান। তিনি জানান, মাদকের জগতে জড়িয়ে পড়ার পর তিনি স্কুল পর্যায়ের অনেক শিক্ষার্থীকেও ইয়াবা সেবন করতে দেখেছেন। বিয়ে হওয়ার পর তিনি নতুন বাজার এলাকায় সান ফ্লাওয়ার স্কুলে পড়ার সময় সহপাঠীদের ইয়াবা সেবনের বিষয়টি প্রত্যক্ষ করেন।

মাদকাসক্তির চিকিৎসায় আহ্ছানিয়া মিশনের কেন্দ্রে ভর্তি রয়েছেন এমবিবিএস ডিগ্রিধারী এক নারী চিকিৎসক। কয়েক বছর আগে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়ে দীর্ঘ সময় আইসিউতে চিকিৎসাধীন ছিলেন তিনি। টানা কয়েক মাস ব্যথানাশক ইনজেকশন নেওয়ার পর সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরলেও তিনি সেই ব্যথানাশকের প্রতি নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। তিনি বলেন, ঘটনাক্রমে মাদকের প্রতি তার আসক্তি তৈরি হলেও বাস্তবে চিকিৎসকদের কেউ কেউ অনেক সময় প্রচণ্ড পেশাগত চাপের কারণে মাদকের দিকে ঝুঁকে পড়েন। কেউবা পদোন্নতি সংক্রান্ত পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়ার ভয়ে কিংবা হতাশা থেকেও মাদক নিয়ে থাকেন। তবে চিকিৎসকদের মধ্যে কেউ সাময়িকভাবে মাদকে জড়িয়ে পড়লেও শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সক্ষম হন।

ইয়াবা ছাড়াও সম্প্রতি তরুণীদের অনেককে বারে গিয়ে মদ পান করতে দেখা যায়। চলতি বছর মদ পানের পারমিট বা লাইসেন্স পেতে হাজারেরও বেশি তরুণী নারকোটিক্সে আবেদন জমা দিয়েছেন। এদের মধ্যে ৩০ জুন পর্যন্ত প্রায় ৭ শতাধিক তরুণীর নামে পারমিট ইস্যু করা হয়েছে। নারকোটিক্সের তথ্য অনুযায়ী রাজধানীর গুলশান, তেজগাঁও এবং উত্তরা এলাকায় মদ পানকারী নারীর সংখ্যা সর্বোচ্চ। চলতি বছর এ তিন এলাকার মধ্যে গুলশানে ২৮৮, উত্তরায় ২০৭ এবং তেজগাঁওয়ে ৬২ জন নারী মদ পানের পারমিট নিয়েছেন। এছাড়া ধানমন্ডি, মতিঝিল, খিলগাঁও এবং রমনা এলাকা থেকেও নারীরা আবেদন করেছেন। এদের একটি বড় অংশ বিভিন্ন মদের বারে পেশাদার ‘বার গার্ল’ হিসেবে কাজ করেন।

প্রচলিত আইন অনুযায়ী বাংলাদেশে মুসলিমদের মদ পানের লাইসেন্স প্রাপ্তির সুযোগ নেই। তবে বিশেষ কিছু রোগ নিরাময়ের জন্য চিকিৎসকরা অনেক সময় সীমিত অ্যালকোহল পানের অনুমোদন দিয়ে থাকেন। আইনের এমন ফাঁক কাজে লাগিয়ে এবং নারকোটিক্সের কতিপয় অসাধু সদস্যের সহযোগিতায় অনেকে পারমিট নিচ্ছেন। এমনকি ভুয়া বা নামসর্বস্ব চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র ব্যবহার করেও প্রতিবছর প্রচুর পরিমাণে পারমিট ইস্যু করা হচ্ছে। মাদকাসক্ত তরুণীদের একটি বড় অংশ ইয়াবা সেবন করেন, যা ওজন কমানোর ভুল ধারণা থেকে অনেকে শুরু করেন। অথচ দীর্ঘমেয়াদে এটি বন্ধ্যত্বসহ বড় ধরনের স্বাস্থ্যগত জটিলতা তৈরি করে।

আহ্ছানিয়া মিশনের নারী মাদকাসক্তি নিরাময়কেন্দ্রের পরামর্শক আঞ্জুমান আরা বলেন, সম্প্রতি শিক্ষিত তরুণীদের মধ্যেও মাদক সেবনের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। তাদের প্রতিষ্ঠানে ১৭ বছরের কিশোরী থেকে ৪৮ বছর বয়সি নারীরাও মাদকাসক্তির চিকিৎসা নিতে ভর্তি হচ্ছেন। নারকোটিক্সের কর্মকর্তারা বলছেন, নারীদের ক্রমশ মাদকের দিকে ঝুঁকে পড়ার প্রবণতা যে কোনো সমাজের জন্য উদ্বেগের। পরিবারে বাবা বা বড় ভাই সিগারেট বা অ্যালকোহল পান করলে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে পরিবারের অন্যরাও এতে আগ্রহী হয়ে ওঠেন, যা এই ভয়াবহ পরিস্থিতির অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


আমাদের ফেসবুক পেইজ