মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ০৮:৩৮ অপরাহ্ন
শিরোনাম :
রেকর্ড পাথর উত্তোলনে নতুন মাইলফলক স্পর্শ করলো মধ্যপাড়া খনি দেশের চার জেলায় নতুন পুলিশ সুপার নিয়োগ শ্রমিক আন্দোলনে ফ্যাসিবাদের দায় সরকারের, মন্তব্য নাহিদ ইসলামের এসআরবির মহাপরিচালক হলেন ফারুক আহমেদ তিন মেগা প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়নের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর জাতীয় ক্রিকেট লিগে রুদ্ধশ্বাস জয় পেল চট্টগ্রাম, খুলনার বড় জয় ৪ দিন গ্যাস সরবরাহ বন্ধের খবর গুজব: পেট্রোবাংলা নেত্রকোনায় সাংবাদিক নিহতের ঘটনায় তদন্তে উঠে আসছে নতুন নানা সূত্র নেত্রকোনায় মুক্তিপণ দাবির মামলায় ১৯ মামলার আসামী বদি গ্রেপ্তার যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ভোটগ্রহণ শুরু, নজরে প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট

যুক্তরাষ্ট্রে ইসলামবিদ্বেষের রাজনীতি, শঙ্কায় টেক্সাসের মুসলিমরা

প্রতিবেদকের নাম

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের ঠিক আগমুহূর্তে দেশজুড়ে ইসলামবিদ্বেষ ও মুসলিমবিরোধী রাজনৈতিক বয়ান আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে। বিশেষ করে টেক্সাসের রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে মুসলিমদের লক্ষ্য করে নীতিনির্ধারণী তৎপরতা ও বিদ্বেষমূলক বক্তব্যের কারণে স্থানীয় ভোটারদের মধ্যে বড় ধরনের শঙ্কা তৈরি হয়েছে। রাজ্যজুড়ে কোনো মুসলিম প্রার্থী নির্বাচনে না থাকলেও, এই নির্বাচনকে ঘিরে স্থানীয় মুসলিম সম্প্রদায়ের উদ্বেগ ও সম্পৃক্ততা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। মিশিগানে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির সিনেট প্রার্থী আবদুল এল-সাইয়েদের মতো নেতারা এর অন্যতম উদাহরণ। তবে রিপাবলিকান-নিয়ন্ত্রিত এই অঙ্গরাজ্যে মুসলিমবিরোধী বক্তব্য ও নীতিগত পদক্ষেপ যেভাবে বেড়েছে, তা তাদের উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে কখনো কেউ সরকারে মুসলিম আইন চাপিয়ে দেয়নি।’। ইসলামবিদ্বেষ পর্যবেক্ষণকারী বিভিন্ন সংগঠনের দাবি, টেক্সাসের রাজনীতিবিদরা কয়েকটি বিচ্ছিন্ন ঘটনাকে বড় করে দেখাচ্ছেন। খ্রিষ্টান ও ইহুদি সম্প্রদায়ের মধ্যেও এ ধরনের স্বেচ্ছামূলক সালিশব্যবস্থার প্রচলন রয়েছে।

আইনজীবী সামির নাজজাম, যিনি গত ৩ নভেম্বর ভোটের আগে হিউস্টনের একটি ইসলামিক সেন্টারের ‘ফল ফেস্ট’ অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলেন, তিনি রাজনীতিতে ইসলামবিদ্বেষের প্রভাব নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। ৪৫ বছর বয়সি এই আইনজীবীর মতে, প্রাপ্তবয়স্কদের তুলনায় শিশুরা এই পরিস্থিতির শিকার বেশি হচ্ছে। কারণ হিসেবে তিনি জানান, নির্দিষ্ট কিছু সংবাদমাধ্যমের প্ররোচনায় সাধারণ মানুষের মধ্যে ভুল ধারণা ছড়াচ্ছে, যা মুসলিম শিশুদের জন্য প্রতিকূল পরিবেশ তৈরি করছে। তবে এই পরিস্থিতি শুধু জাতীয় রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ নয়। তিনি বলেন, ‘প্রাপ্তবয়স্করা নিজেদের পছন্দমতো মানুষের সঙ্গে মেলামেশা করতে পারেন। তাদের পরিবারের কেউ কেউ নির্দিষ্ট কিছু সংবাদমাধ্যম দেখে। তিনি আরও বলেন, ‘আমরা তা করতেও পারি না। আমরা শুধু নিজেদের ধর্মীয় রীতিনীতি পালন করি।’।

টেক্সাসের মোট জনসংখ্যার দুই শতাংশেরও কম মুসলিম হলেও, এবার তারা ভোটের মাধ্যমে নিজেদের রাজনৈতিক শক্তিমত্তা প্রদর্শনের চেষ্টা করছেন। তবে এবার ভোটার উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে রাজনৈতিকভাবে নিজেদের শক্তি দেখাতে চান সম্প্রদায়টির সংগঠকরা। গত দুই বছরে এমনও ভেবেছি, যুক্তরাষ্ট্র ছেড়েই চলে যাব।’। টেক্সাস ট্রিবিউনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এক ঘটনায় দলটির বিদায়ী চেয়ারম্যান আব্রাহাম জর্জ দুই মুসলিম প্রতিনিধিকে দল ছেড়ে চলে যেতে বলেন।

হিউস্টনের ৩০টির বেশি মসজিদের দেখভালের দায়িত্বে থাকা ‘ইসলামিক সোসাইটি অব গ্রেটার হিউস্টন’-এর সভাপতি এমরান গাজীর মতে, মুসলিমদের সর্বত্র কোণঠাসা করার চেষ্টা চলছে।

পরিস্থিতি বিবেচনায় সংগঠনের পক্ষ থেকে ব্যাপক ভোটার নিবন্ধন কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে এবং জুমার নামাজের সময় মুসল্লিদের বিবেক অনুযায়ী ভোট দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। সংগঠনটি এবার ব্যাপকভাবে ভোটার নিবন্ধন কার্যক্রম বাড়িয়েছে।

গাজীর প্রত্যাশা, যেকোনো নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্তের আগে রাজনীতিবিদরা যেন মুসলিম সম্প্রদায়ের স্বার্থ ও মতামতকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করেন।

পরিস্থিতি অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছেছে বলে মনে করেন ৪২ বছর বয়সি চিকিৎসক মারিয়াম আহমেদ। তিনি তার সন্তানের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কার কথা জানিয়ে বলেন, মুসলিমদের সন্ত্রাসী হিসেবে উপস্থাপনের অপপ্রয়াস তাকে এমন এক পরিস্থিতির মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে, যা থেকে তিনি মুক্তি চাইছেন। টেক্সাসের রিপাবলিকান গভর্নর গ্রেগ অ্যাবট ও রাজ্য রিপাবলিকান পার্টির পক্ষ থেকে নিয়মিতভাবে ‘শরিয়াহ আইন’ ইস্যুটি ব্যবহার করে ইসলামকে একটি আসন্ন হুমকি হিসেবে তুলে ধরার অভিযোগ উঠেছে। সেখান থেকে পাওয়া ধারণার কারণে শিশুরাও একে অপরকে নানা অপ্রীতিকর কথা বলে।’। আমি চাই না, তাকে সন্ত্রাসী হিসেবে দেখা হোক। আমি চাই না আমার সন্তানকেও একই অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যেতে হোক।’। সম্প্রতি হিউস্টনে বসবাস শুরু করা ৩৩ বছর বয়সি চিকিৎসক সারাহ দাব্বাস বলেন, ‘বাস্তব জীবনে সবাইকে যেভাবে দেখানো হচ্ছে, মানুষ আসলে ততটা বিদ্বেষী নয়।

গত মাসে ডালাসে অনুষ্ঠিত রিপাবলিকান কনভেনশনে গভর্নর গ্রেগ অ্যাবট ওয়াশিংটনের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় না থেকে টেক্সাসে শরিয়াহ আইন নিষিদ্ধ করার ঘোষণা দেন।

একই সুর শোনা গেছে সিনেটর টেড ক্রুজের কণ্ঠেও, যিনি শরিয়াহ আইনকে মার্কিন সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে দাবি করেছেন। গত জুনে রিপাবলিকান পার্টি ‘ডোন্ট শরিয়াহ মাই টেক্সাস’ নামক রাজনৈতিক কর্মসূচি গ্রহণ করে এবং রাজ্য আইনসভায় ‘শরিয়াহ-ফ্রি টেক্সাস ককাস’ নামে একটি জোটে ৩৮ জন আইনপ্রণেতা যুক্ত হয়েছেন। এছাড়া কংগ্রেসে চিপ রয় ও কিথ সেলফের নেতৃত্বে গঠন করা ‘শরিয়াহ-ফ্রি আমেরিকা ককাস’-এ সদস্যসংখ্যা ৬৮ জনে দাঁড়িয়েছে। ১৫০ সদস্যের রাজ্য আইনসভায় ইতোমধ্যে এই জোটে ৩৮ জন সদস্য যুক্ত হয়েছেন।

অথচ বিশ্লেষকদের মতে, টেক্সাস বা যুক্তরাষ্ট্রের কোথাও শরিয়াহ আইন চালু হওয়ার কোনো বাস্তবতা নেই। মানবাধিকারকর্মীরা মনে করেন, শরিয়াহ আইন নিয়ে রাজনীতিবিদদের প্রচারণা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘দ্য ব্রিজ ইনিশিয়েটিভ’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, টেক্সাসের রাজনীতিবিদরা মুসলিমদের সামাজিক উন্নয়ন ও জনজীবনে সাধারণ অংশগ্রহণকেও ইসলামি আইনের প্রভাব হিসেবে ভুলভাবে উপস্থাপন করছেন। তাদের অভিযোগ, মুসলিমদের সক্রিয় নাগরিক হিসেবে বেঁচে থাকাকেও তারা এক ধরনের হুমকি হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করছেন। তাদের মতে, রাজনীতিতে মুসলিমদের নিয়ে নেতিবাচক প্রচারণার প্রভাব পড়ছে পরিবার, সন্তান এবং দৈনন্দিন সামাজিক জীবনে।

বিদ্বেষের এই রাজনীতি থেকে রেহাই পাচ্ছেন না রিপাবলিকান মতাদর্শের মুসলিমরাও। গত জুন মাসে টেক্সাস রিপাবলিকান পার্টির সম্মেলনে দলের এক সিনেটর শরিয়াহ আইনের দোহাই দিয়ে মুসলিমদের প্রতারক হিসেবে অভিযুক্ত করার চেষ্টা করেন। এছাড়া গভর্নর অ্যাবট ও অ্যাটর্নি জেনারেল কেন প্যাক্সটনের উদ্যোগে কাউন্সিল অন আমেরিকান-ইসলামিক রিলেশনস (কেয়ার)-কে ‘বিদেশি সন্ত্রাসী সংগঠন’ হিসেবে চিহ্নিত করার উদ্যোগ ও মামলা দায়েরের ঘটনা ঘটেছে। এর বিপরীতে কেয়ার কর্তৃপক্ষ তাদের সাংবিধানিক অধিকার ও বাক্‌স্বাধীনতার দাবিতে গভর্নর অ্যাবটের বিরুদ্ধে পাল্টা মামলা করেছে। এতে শরিয়াহ আইনের সমর্থকদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি শাস্তি, সরকারি চাকরি, সামরিক বাহিনী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীতে কাজের অযোগ্য ঘোষণা, নাগরিকত্ব বাতিল এবং দেশ থেকে বহিষ্কারের মতো পদক্ষেপের কথা বলা হয়। এর মধ্যে রয়েছে উত্তর টেক্সাসে মুসলিমদের জন্য বিশেষ আবাসন প্রকল্প গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া একটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে তদন্ত এবং স্বেচ্ছায় ইসলামি সালিশ পরিচালনাকারী সংগঠনগুলোর কার্যক্রম।

অনেক রক্ষণশীল মুসলিম রিপাবলিকান রাজনীতির ব্যবসায়িক ও পারিবারিক মূল্যবোধের সাথে একমত হলেও, বর্তমান পরিস্থিতির কারণে তারা নির্দিষ্ট কিছু প্রার্থীকে ভোট দেওয়া থেকে বিরত থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তবে সংগঠকদের মতে, টেক্সাসের বৈচিত্র্যময় মুসলিম সমাজকে ঐক্যবদ্ধ রাজনৈতিক শক্তিতে রূপ দেওয়া একটি চ্যালেঞ্জ। সানিয়া রহিমের মতো কর্মীরা মনে করেন, কেবল প্রচারণাই যথেষ্ট নয়, বরং যথাযথ সচেতনতার মাধ্যমেই দীর্ঘমেয়াদী পরিবর্তন সম্ভব। স্থানীয় মুসলিম ভোটারদের মধ্যে এখন একটাই বার্তা—ভোটের মাধ্যমেই এই বিদ্বেষী রাজনীতির জবাব দিতে হবে। এটি বন্ধ করতে আমাদের এখনই ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।’।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


আমাদের ফেসবুক পেইজ