দেশের শিল্পখাতে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং সুদের হার কমানোর ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্বারোপ করেছে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই)। শনিবার রাজধানীর মতিঝিলে ডিসিসিআই অডিটোরিয়ামে আয়োজিত ‘২০২৬ অর্থবছরের দ্বি-বার্ষিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, প্রেক্ষিত রাজস্ব ও মুদ্রানীতি এবং বেসরকারিখাতের প্রত্যাশা’ শীর্ষক সেমিনারে সংগঠনটি এই আহ্বান জানায়। সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ডিসিসিআই সভাপতি তাসকীন আহমেদ। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
অনুষ্ঠানে পিপিআরসি’র নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর রহমান, আইসিসি বাংলাদেশের সভাপতি মাহবুবুর রহমান, পিআরআই চেয়ারম্যান ড. জায়েদি সাত্তার, সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান এবং ট্রান্সকম গ্রুপের সিইও সিমিন রহমানসহ বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন। সেমিনারে তাসকীন আহমেদ বলেন, বর্তমানে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি মাত্র ৫ শতাংশে নেমে এসেছে, যা বিনিয়োগের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক। অথচ সরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ২৫ দশমিক ৯ শতাংশ। দীর্ঘমেয়াদী উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও ঋণের উচ্চ ব্যয় ব্যবসা-বাণিজ্যে বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করেছে।
তিনি আরও জানান, ২০২৬ সালে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ৩ দশমিক ১ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে মধ্যপ্রাচ্যের সংকট, সরবরাহ ব্যবস্থায় প্রতিবন্ধকতা, জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি এবং পণ্য পরিবহনের খরচ দ্বিগুণ হয়ে যাওয়ায় বৈশ্বিক অর্থনীতি চাপের মুখে পড়েছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় জ্বালানি আমদানির উৎস বহুমুখী করার পাশাপাশি দেশি-বিদেশি বিনিয়োগে অফশোর গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রম জোরদার করার পরামর্শ দেন তিনি।
সিএমএসএমই খাতের নাজুক অবস্থার কথা তুলে ধরে ডিসিসিআই সভাপতি বলেন, এই খাতে ঋণ প্রবাহের লক্ষ্যমাত্রা ২৫ শতাংশ থাকলেও বাস্তবে তা ১৬ দশমিক ৮ শতাংশে আটকে আছে। ব্যবসার খরচ বেড়ে যাওয়ায় খেলাপি ঋণের হার বেড়ে ২৪ দশমিক ১ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এই সংকট কাটাতে প্রচলিত জামানতনির্ভর ব্যবস্থার পরিবর্তে ডিজিটাল ক্রেডিট স্কোরিংয়ের মাধ্যমে ঋণ প্রদান এবং সাশ্রয়ী মূল্যে যন্ত্রপাতি কেনার জন্য বিশেষ তহবিল গঠনের প্রস্তাব দেন তিনি।
কৃষিখাতের উন্নয়নে সৌরচালিত সেচ ব্যবস্থায় বিনিয়োগ সহজ করতে স্বল্পসুদের ঋণ চালুর ওপর গুরুত্ব দেন তাসকীন আহমেদ। এছাড়া বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি পর্যালোচনার মাধ্যমে অপ্রয়োজনীয় ভর্তুকির চাপ কমিয়ে দীর্ঘমেয়াদে সহনীয় বিদ্যুতের দাম নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তিনি। তিনি বলেন, লজিস্টিক ব্যবস্থার আধুনিকায়নে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের (পিপিপি) আওতায় বড় বিনিয়োগ আকর্ষণ করা জরুরি।
চলতি বাজেটের সংস্কারমূলক উদ্যোগগুলোর প্রশংসা করে তিনি বলেন, কোম্পানি নিবন্ধন প্রক্রিয়া ৪৮ ঘণ্টায় সম্পন্ন করা, বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধা বাড়ানো এবং রপ্তানি সক্ষমতা বাড়াতে নতুন ১০টি খাতকে শুল্কমুক্ত সুবিধার আওতায় আনার সিদ্ধান্ত ইতিবাচক। এছাড়া কর ব্যবস্থাপনায় অটোমেশন, কাস্টমস প্রক্রিয়া দ্রুত করা এবং এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতি হিসেবে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে পিটিএ ও এফটিএ চুক্তি সম্পন্ন করার ওপর জোর দেন তিনি।
পরিশেষে, ব্যাংক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, খেলাপি ঋণ হ্রাস এবং আর্থিক খাতের প্রতি জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনার ওপর গুরুত্বারোপ করেন ডিসিসিআই সভাপতি। তিনি বলেন, যথাযথ নীতিগত সমন্বয়, কার্যকর সংস্কার এবং সরকারি-বেসরকারি খাতের নিবিড় অংশীদারত্বের মাধ্যমে বর্তমান অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জগুলোকে সুযোগে রূপান্তর করা সম্ভব। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: বেসরকারি খাতের প্রত্যাশা তুলে ধরে ডিসিসিআই সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি ধীরে ধীরে সুদের হার কমিয়ে সহনীয় পর্যায়ে আনতে হবে, যদিও এরই মধ্যে ৫০ বেসিস পয়েন্ট হ্রাস পেয়েছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তিনি বলেন, ঘোষিত সিএমএসএমই সহায়তা প্যাকেজের ৫ হাজার কোটি টাকার কার্যকর বাস্তবায়ন, স্বচ্ছ তদারকি এবং প্রকৃত উৎপাদনমুখী উদ্যোক্তাদের কাছে সহজে অর্থ পৌঁছানো নিশ্চিত করতে হবে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতা নিঃসন্দেহে চ্যালেঞ্জপূর্ণ। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এসব সংস্কার বাস্তবায়িত হলে দেশে ব্যবসা পরিচালনা আরও সহজ হবে বলে আশা প্রকাশ করেন ডিসিসিআই সভাপতি। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: একই সঙ্গে রপ্তানির ক্ষেত্রে লিড টাইম কমাতে শিল্পাঞ্চলগুলোতে নিরবচ্ছিন্ন সব ধরনের সেবা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।