ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের অবিলম্বে পদত্যাগের দাবিতে উত্তাল মুম্বাইয়ের ঐতিহাসিক শিবাজি পার্ক। শুক্রবার (২ অক্টোবর) এক বিশাল সমাবেশে ককরোচ জনতা পার্টির (সিজিপি) প্রতিষ্ঠাতা ও নেতা অভিজিৎ দীপকে আগামী ১০ অক্টোবর থেকে নতুন প্রজন্মের প্রতিনিধিদের নিয়ে ‘চলো দিল্লি’ কর্মসূচির ডাক দিয়েছেন। তাদের লক্ষ্য হলো দিল্লিতে ‘জন্তর মন্তর ২.০’ গড়ে তোলা এবং অবাধ নির্বাচন নিশ্চিত করা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘এক্সে’ দেওয়া পোস্টে দীপকে জানান, প্রধান নির্বাচন কমিশনার পদত্যাগ না করলে সারা দেশ থেকে তাদের সমর্থকরা শান্তিপূর্ণভাবে দিল্লি অভিমুখে যাত্রা শুরু করবেন। শুক্রবার (২ অক্টোবর) ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
পুলিশের নিষেধাজ্ঞা ও ব্যারিকেড উপেক্ষা করে তীব্র গরম ও তাপপ্রবাহের মধ্যেই অসংখ্য শিক্ষার্থী ও তরুণ-তরুণী শিবাজি পার্কে সমবেত হন। সমাবেশে সিজিপির অন্যতম নেতা অজিন্ক্য শিন্ডে দাবি করেন, জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা দায়ের করতে হবে। একই সঙ্গে তিনি ২০২৫ সালের ভোটার তালিকা স্থগিত এবং ২০২৩ সালে পাস হওয়া বিতর্কিত নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ আইন বাতিলের দাবি জানিয়েছেন। পুলিশের অনুমতি না থাকা সত্ত্বেও দুপুর থেকে কড়া নিরাপত্তা ও ব্যারিকেড ভেঙে প্রখর রোদ ও তাপপ্রবাহ উপেক্ষা করে মধ্য মুম্বাইয়ের শিবাজি পার্কে বিপুলসংখ্যক তরুণ-তরুণী ও শিক্ষার্থী সমবেত হন।
অভিজিৎ দীপকে সরকারের সমালোচনা করে বলেন, নির্বাচন কমিশনের অনিয়ম মহারাষ্ট্র থেকে শুরু হয়েছে বলেই তারা আন্দোলনের সূচনা এখান থেকে করেছেন। তার অভিযোগ, গত দুই বছরে প্রায় ১৩ কোটি ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি ও ইন্ডিয়া জোটের ভোটের ব্যবধান ছিল মাত্র ২ শতাংশ। এই ব্যবধান বাড়াতে নির্বাচনের মাত্র ১৫ দিন আগে জ্ঞানেশ কুমারকে সিইসি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল বলে তিনি দাবি করেন। সমাবেশে উপস্থিত জনতার উদ্দেশে অভিজিৎ দীপকে বলেন, ভোটার তালিকা থেকে ব্যাপক হারে নাম ছাঁটাই করার পর ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) এমন সব রাজ্যে জয়লাভ করেছে, যেখানে নরেন্দ্র মোদির জোয়ার যখন তুঙ্গে ছিল তখনও তারা জিততে পারেনি। সরকারের তীব্র সমালোচনা করে সিজিপি প্রতিষ্ঠাতা বলেন, এই সরকার এতটাই অযোগ্য যে ‘নিট’ পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস নিয়ে জন্তর মন্তরে আন্দোলনের ঠিক দুই মাসের মাথায় আমাদের আবারও রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ জানাতে হচ্ছে। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে মোট ৯৭ কোটি নিবন্ধিত ভোটার ছিলেন।
সিজিপি নেতার অভিযোগ, বিজেপি বিভিন্ন রাজ্যে ভোট ‘চুরি’ করেছে। উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, মহারাষ্ট্র বিধানসভা নির্বাচনে ৪০ লাখ নতুন ভোটার যোগ করা হয়েছে। দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়ালের আসন থেকে ৪০ হাজার ভোটার বাদ দেওয়া হয়, ফলে তিনি মাত্র ৪ হাজার ভোটে পরাজিত হন। এছাড়া তামিলনাড়ুতে এম কে স্টালিনের আসন থেকে এক লাখ ভোটার এবং পশ্চিমবঙ্গে মমতা ব্যানার্জির আসন থেকেও ভোটার বাদ দিয়ে তাদের পরাজিত করার অভিযোগ করেন তিনি।
বিজেপির ‘এক দেশ, এক নির্বাচন’ পরিকল্পনার তীব্র সমালোচনা করে দীপকে বলেন, এর উদ্দেশ্য হলো ‘এক দেশ, এক দল’ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা। বিজেপি বিরোধী দলগুলো নির্মূল করতে শিবসেনা ও এনসিপির মতো দলগুলোকে ভাঙছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন। সমাবেশে নাসিরুদ্দিন শাহ, শাবানা আজমি, বিশাল ভরদ্বাজ ও তুষার গান্ধীর মতো বিশিষ্ট ব্যক্তিরা সংহতি জানিয়ে উপস্থিত ছিলেন। একযোগে জাতীয় নির্বাচন বা ‘সাইমুলটেনিয়াস ইলেকশন’ আয়োজনের প্রস্তাবের কথা উল্লেখ করে তিনি দাবি করেন, ক্ষমতাসীন বিজেপির আসল উদ্দেশ্য হলো— ‘এক দেশ, এক নির্বাচন, এক দল’ ব্যবস্থা কায়েম করা।
এদিকে রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবার বিকাল ৩টা পর্যন্ত নতুন দিল্লিতে আম আদমি পার্টির নেতা আতিশি মারলেনা, বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের সদস্য ও আন্দোলনকারীসহ ৫০০ জনের বেশি ব্যক্তিকে আটক করেছে দিল্লি পুলিশ। এই গ্রেপ্তারের ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে সিজিপি নেতা সৌরভ দাস পুলিশকে সতর্ক করে বলেছেন, বর্বরতা বন্ধ না করলে তাদের কঠোর জবাব দেওয়া হবে। এদিকে শুক্রবার বিকাল ৩টা পর্যন্ত পাওয়া খবরে বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানায়, নয়াদিল্লিতে প্রাক্তন দিল্লি মুখ্যমন্ত্রী আতিশি মারলেনা, বিরোধী দল আম আদমির সদস্য এবং ছাত্র সংগঠনের সদস্যসহ ৫০০ জনেরও বেশি লোককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
বিক্ষোভকারীরা ‘জ্ঞানু, তোমার কি গণতন্ত্রের ওপর ভরসা নেই?’, ‘জ্ঞানেশ ভাই, পদত্যাগ করো’ সম্বলিত পোস্টার নিয়ে প্রতিবাদ জানান। শিক্ষার্থী মণীশ মণ্ডল ‘মেলোডি’ চকলেটের গহনা পরে এবং এআইএসএফ সমর্থকরা বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে অভিনব উপায়ে প্রতিবাদ প্রদর্শন করেন। সমাবেশে অহিংসার বার্তা ছড়িয়ে দিতে মহাত্মা গান্ধী ও ড. বি আর আম্বেদকরের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হয় এবং জাতীয় সংগীতের সুর বাজানো হয়। আইন শিক্ষার্থী অয়ন প্যাটেলসহ হাজারো কর্মী এই আন্দোলনে যোগ দিয়ে গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষার লড়াই চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার করেছেন। এরপর জন্তর মন্তরে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন করবে।