ঢাকাসহ দেশের সকল সিটি করপোরেশন এলাকায় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা বা ই-রিকশা চলাচলের ক্ষেত্রে একটি নতুন নীতিমালা জারি করেছে সরকার। গত ২৯ অক্টোবর স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগ এই সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপনটি প্রকাশ করে। ‘সিটি কর্পোরেশন এলাকায় তিন চাকার স্বল্পগতির ব্যাটারিচালিত রিকশা (ই-রিকশা) চলাচল বিধিমালা, ২০২৬’ শিরোনামের এই নীতিমালা অবিলম্বে কার্যকর হবে বলে জানানো হয়েছে।
নতুন এই নিয়মের আওতায়, এখন থেকে কোনো ই-রিকশা নিবন্ধন ছাড়া রাস্তায় নামানো যাবে না। প্রতিটি সিটি করপোরেশন তাদের নিজস্ব ট্রাফিক বিভাগের সাথে আলোচনা করে ই-রিকশার সংখ্যা নির্দিষ্ট করবে। এলাকাভেদে বা জোনভিত্তিক অনুমতির এই বিধানের পাশাপাশি, জাতীয় মহাসড়ক, এক্সপ্রেসওয়ে, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে এবং বাস চলাচলের প্রধান করিডোরে এই যান চলাচল সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এছাড়া প্রশাসন কর্তৃক নিষিদ্ধ ঘোষিত অন্য কোনো সড়কেও এগুলো চলতে পারবে না। পর্যায়ক্রমে ই-রিকশাগুলোকে বিমার আওতায় আনা হবে।
গতির বিষয়ে নীতিমালায় স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। সাধারণ ক্ষেত্রে ই-রিকশার সর্বোচ্চ গতি ঘণ্টায় ২৫ কিলোমিটারের মধ্যে থাকতে হবে। তবে স্কুল, হাসপাতাল, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও জনবহুল এলাকায় সর্বোচ্চ গতিসীমা নির্ধারণ করা হয়েছে ঘণ্টায় ১৫ কিলোমিটার। প্রতিটি যানে স্পিডোমিটার বা ওডোমিটার থাকা বাধ্যতামূলক। এছাড়াও ফুটপাতে যান চালানো, মোবাইল ব্যবহার, অহেতুক লেন পরিবর্তন বা নিয়মবহির্ভূত ওভারটেকিং নিষিদ্ধ করা হয়েছে। চালকদের সব সময় রাস্তার বাম লেন অনুসরণ করতে হবে। নতুন বিধিমালায় দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে চালকের দায়বদ্ধতাও নির্ধারণ করা হয়েছে।
যাত্রী পরিবহন ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত নতুন বিধানে বলা হয়েছে, ই-রিকশায় চালক ছাড়া সর্বোচ্চ দুই বা চারজন যাত্রী পরিবহন করা যাবে। বাণিজ্যিক মালামাল পরিবহন নিষিদ্ধ। শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে ৪০ ডেসিবেলের বেশি তীব্রতার হর্ন ব্যবহার করা যাবে না। প্রতিটি ই-রিকশার ব্যবহারযোগ্য অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল হবে নিবন্ধনের তারিখ থেকে ১২ বছর। এরপর নম্বর প্লেটসহ নিবন্ধন বাতিল হয়ে যাবে। এছাড়া দুর্ঘটনা ঘটলে চালককে তাৎক্ষণিকভাবে গাড়ি থামিয়ে আহতদের সহায়তা করতে হবে এবং পুলিশকে বিষয়টি জানাতে হবে।
নিবন্ধনের প্রক্রিয়া ও ফি সংক্রান্ত তথ্যে দেখা যায়, আবেদনকারীকে অবশ্যই বাংলাদেশের নাগরিক হতে হবে।
আবেদনের সাথে জাতীয় পরিচয়পত্র, ছবি ও ফিটনেস সনদ জমা দিতে হবে। সব শর্ত যাচাই শেষে ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে নিবন্ধন প্রদান করা হবে। কিউআর কোডসহ একটি স্বতন্ত্র নিবন্ধন নম্বর ও প্লেট দেওয়া হবে যা গাড়িতে দৃশ্যমান রাখতে হবে। নিবন্ধনের মেয়াদ হবে পাঁচ বছর এবং একজন ব্যক্তি সর্বোচ্চ পাঁচটি রিকশা নিবন্ধন করতে পারবেন। তবে এক সিটি করপোরেশনে নিবন্ধিত রিকশা অন্য করপোরেশনে বাণিজ্যিকভাবে চলাচল করতে পারবে না। জাতীয় পরিচয়পত্রের সত্যায়িত অনুলিপি, সদ্য তোলা দুই কপি পাসপোর্ট আকারের সত্যায়িত ছবি, নিবন্ধন ফি জমার রসিদ এবং নির্ধারিত ফিটনেস সনদসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করতে হবে।
নিবন্ধন ফি হিসেবে দুই যাত্রী ধারণক্ষমতার ই-রিকশার জন্য এককালীন আট হাজার টাকা এবং চার যাত্রী ধারণক্ষমতার জন্য ১০ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। বার্ষিক নবায়ন ফি যথাক্রমে চার হাজার ও পাঁচ হাজার টাকা। ফিটনেস সনদের ফি ধরা হয়েছে এক হাজার টাকা। সিটি করপোরেশন বিনামূল্যে কিউআর কোডসহ নম্বর প্লেট ও ব্লু-বুক সরবরাহ করবে এবং সংগৃহীত ফি রাজস্ব আয় হিসেবে গণ্য হবে।
প্রযুক্তিগত মানদণ্ডের বিষয়ে বলা হয়েছে, প্রতিটি রিকশাকে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) নির্ধারিত নিরাপত্তা বৈশিষ্ট্য পূরণ করতে হবে। বর্তমানে চলাচলকারী রিকশাগুলোকেও কাঠামোগত পরিবর্তন এনে অনুমোদন নিতে হবে। ই-রিকশা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান অনুমোদনের জন্য স্থানীয় সরকার বিভাগের একজন অতিরিক্ত সচিবের নেতৃত্বে একটি বিশেষ কমিটি গঠনের বিধান রাখা হয়েছে।
পার্কিং ও চার্জিং ব্যবস্থার ক্ষেত্রেও নতুন নিয়ম কার্যকর হবে। প্রতিটি ওয়ার্ডে নির্দিষ্ট পার্কিং এলাকা থাকবে এবং অনুমোদিত চার্জিং পয়েন্ট বা গ্যারেজে রিকশা চার্জ দিতে হবে। এসব স্থানে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ ব্যবহার বা পুরোনো ব্যাটারি উন্মুক্ত স্থানে ফেলা পরিবেশ আইন অনুযায়ী অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুমতি ছাড়া ব্যাটারি গলানো বা ভাঙাও নিষিদ্ধ। একই সঙ্গে পুরোনো বা অকার্যকর ব্যাটারি উন্মুক্ত স্থান, মাটি, জলাশয় কিংবা সাধারণ বর্জ্যে ফেলা বা পোড়ানো নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
অবৈধ ও ত্রুটিপূর্ণ ই-রিকশা প্রতিরোধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। মেট্রোপলিটন পুলিশের ট্রাফিক বিভাগ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট যৌথভাবে বা আলাদাভাবে অভিযান পরিচালনা করতে পারবেন। নিবন্ধহীন গাড়ি চালানো, নিষিদ্ধ এলাকায় প্রবেশ, অতিরিক্ত যাত্রী পরিবহন বা ট্রাফিক সিগন্যাল অমান্য করার মতো অপরাধের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।