দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সামগ্রিক উন্নয়ন ও অপরাধীদের দৌরাত্ম্য কমাতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নতুন আঙ্গিকে একটি বড় ধরনের অভিযানের পরিকল্পনা করছে। এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ২০০২ সালে বিএনপি সরকারের সময় পরিচালিত ‘অপারেশন ক্লিনহার্ট’-এর মডেলটি সামনে রাখা হয়েছে। অপরাধ দমন ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক একাধিক বৈঠক হয়েছে এবং চলতি সপ্তাহে এ নিয়ে আরও আলোচনার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এই অভিযানের আনুষ্ঠানিক কোনো নামকরণ করা হবে কি না, তা নিয়ে নীতিনির্ধারকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নীতিনির্ধারকদের মূল লক্ষ্য হলো, অপরাধীদের মধ্যে কড়া বার্তা পৌঁছে দেওয়া এবং দ্রুত পরিস্থিতির উন্নয়ন ঘটানো। বিশেষ করে কিশোর গ্যাং, চাঁদাবাজ ও মাদক ব্যবসায়ীদের তৎপরতা রোধে কঠোর পদক্ষেপ দৃশ্যমান করার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে সবুজ সংকেত পাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ঘটে যাওয়া কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা এই উদ্যোগকে আরও ত্বরান্বিত করেছে। এর মধ্যে কুমিল্লার বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুলের শিক্ষার্থী অপ্রতিম নিখোঁজ হওয়ার পর ১৮ সেপ্টেম্বর তার অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনাটি জনমনে ব্যাপক শঙ্কা সৃষ্টি করে। এ ঘটনায় কিশোর গ্যাংয়ের সম্পৃক্ততা পাওয়ার তথ্য সামনে এসেছে। এদিকে, ঢাকায় বৃহস্পতিবার মধ্যরাত থেকে পরবর্তী ৪৭ ঘণ্টায় মিরপুর, মোহাম্মদপুর ও আদাবরের মতো এলাকায় বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা, ভাঙচুর ও দখলের চেষ্টার ঘটনা ঘটেছে। এমনকি সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওসহ নিউগিনি প্রপার্টিজেও হামলার ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে কুমিল্লার সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম হত্যাকাণ্ড। এর রেশ কাটতে না কাটতেই ঢাকায় বৃহস্পতিবার মধ্যরাত থেকে পরবর্তী ৪৭ ঘণ্টায় পৃথক চারটি স্থানে হামলা, দখলচেষ্টা, লুটপাট ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। শনিবার রাতে ইসিবি চত্বরে নিউগিনি প্রপার্টিজে কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলা, গুলি, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। আশপাশের কয়েকটি বাড়ি ও স্থাপনাতেও হামলা হয়। সম্প্রতি ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) এক বিবৃতিতে বলেছে, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন নয়; ২০২৪ সালের আগস্টের পরের ঘটনাপ্রবাহের ধারাবাহিকতা।
পুলিশ সদরদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশে সক্রিয় কিশোর গ্যাংয়ের তালিকা হালনাগাদ করা হয়েছে। রাজধানীতে ১৫৯টি গ্যাংয়ের ১ হাজার ৮১২ জন সদস্য রয়েছে, যার মধ্যে মোহাম্মদপুরে ২৭টি এবং পল্লবীতে ১৬টি গ্যাং সক্রিয়। এছাড়া দেশের অন্যান্য মহানগর ও জেলায় আরও ২২৭টি কিশোর গ্যাং এবং ২ হাজার ৫৫০ জন সদস্য পুলিশের নজরদারিতে রয়েছে। জেলাগুলোর মধ্যে নোয়াখালীতে সবচেয়ে বেশি ২৫টি কিশোর গ্যাং সক্রিয় আছে বলে জানা গেছে। মিরপুর-১ নম্বরে গরিব মানুষের স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে দুই থেকে আড়াইশ মানুষের একটি দল হামলা চালিয়ে স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেয়।
অপরাধ দমনের পাশাপাশি আর্থিক সংশ্লিষ্টতা খতিয়ে দেখতেও বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। সিআইডির মানি লন্ডারিং ইউনিট রাজধানীর নেটওয়ার্কের সঙ্গে জড়িত ৪০৬ জন মাদক কারবারি ও তাদের পৃষ্ঠপোষকদের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করেছে। একইভাবে ঢাকা মহানগর পুলিশের কাছে ১ হাজার ৫৩০ জন চাঁদাবাজ ও জমি দখলকারীর তালিকা রয়েছে। পুলিশ সদরদপ্তরের এআইজি শাহাদাত হোসাইন জানান, কিশোর গ্যাং ও মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান অব্যাহত থাকলেও সমাজ ও ওটিটি প্ল্যাটফর্মে গ্যাং সংস্কৃতির নেতিবাচক প্রচারণাও তরুণদের বিপথে নিতে ভূমিকা রাখছে।
মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন এই পরিস্থিতির উদ্বেগ জানিয়ে বলেন, সম্প্রতি সংঘটিত নৈরাজ্য ও মব সন্ত্রাসের ঘটনায় দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। তিনি যৌথ অভিযানের প্রয়োজনীয়তাকে সমর্থন করলেও মানবাধিকার সুরক্ষার বিষয়টি নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সূত্র বলছে, ধারাবাহিক এসব ঘটনার প্রেক্ষাপটেই নতুন ধরনের অভিযানের বিষয়টি আলোচনায় এসেছে।
প্রসঙ্গত, অতীতে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ধরনের অভিযান পরিচালিত হয়েছে। ২০০২ সালে পরিচালিত অপারেশন ক্লিনহার্টে ১২ হাজার মানুষকে গ্রেপ্তার এবং দুই হাজারের বেশি অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছিল, যদিও পরবর্তীতে সেই অভিযানে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ ও দায়মুক্তির বিষয়গুলো ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। পরবর্তীতে ২০১৮ ও ২০১৯ সালে মাদক ও ক্যাসিনোবিরোধী শুদ্ধি অভিযানও পরিচালিত হয়েছিল। এখন নতুন অভিযানের রূপরেখা চূড়ান্ত হলে অপরাধী চক্রের বিরুদ্ধে বড় ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণের সম্ভাবনা রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে। পরদিন কুমিল্লা সদর দক্ষিণের সানন্দা গ্রামের লালমাই পাহাড়ের নির্জন জঙ্গল থেকে তার লাশ উদ্ধার করা হয়।