যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভানিয়া অঙ্গরাজ্যের এরি শহরে সংঘটিত ভয়াবহ পারিবারিক ট্র্যাজেডির ঘটনায় তদন্তে নতুন ও চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে। ৪৫ বছর বয়সী ম্যাথিউ স্টোন নামের ওই ব্যক্তি নিজের বাড়িতে স্ত্রী ও সন্তানসহ মোট আটজনকে আগ্নেয়াস্ত্রের মুখে প্রাণ কেড়ে নেওয়ার পর নিজে প্রাণত্যাগ করেন। গত ১৫ অক্টোবর এক সংবাদ সম্মেলনে এরি শহরের পুলিশপ্রধান রিক লোরাহ জানান, তদন্তকারীরা ঘটনাস্থলে গিয়ে বাড়িটিকে অত্যন্ত শোচনীয় ও অস্বাস্থ্যকর অবস্থায় দেখতে পান। শৌচাগার ও বেসিন অকেজো থাকার পাশাপাশি ঘরজুড়ে প্রস্রাবভর্তি অসংখ্য দুই লিটারের প্লাস্টিকের বোতল পড়ে থাকতে দেখা যায়।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, গত ৯ অক্টোবর সন্ধ্যায় পেরি স্ট্রিটের ওই বাড়িতে এই মর্মান্তিক ঘটনাটি ঘটে। ম্যাথিউ দীর্ঘদিন ধরে পরিবারের সদস্যদের ওপর চরম নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছিলেন। পরিবারের অর্থ ব্যয় থেকে শুরু করে বাড়ির বাইরে যাওয়া কিংবা স্বজনদের সঙ্গে মেলামেশা—সবকিছুই তার কঠোর নজরদারিতে চলত। তদন্তকারীদের মতে, স্ত্রী মিশেল স্টোন প্রথম সন্তানসম্ভবা হওয়ার পর থেকে ম্যাথিউয়ের এই নিয়ন্ত্রণপ্রবণ আচরণ অস্বাভাবিক মাত্রায় বৃদ্ধি পায়। এর ফলে পরিবারের সদস্যরা বাইরের জগত থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিলেন। পরিবারের সদস্যদের অর্থকড়ি ব্যবহারের সিদ্ধান্ত তিনিই নিতেন। কখন তারা বাড়ির বাইরে যেতে পারবেন কিংবা আত্মীয়দের সঙ্গে সময় কাটাতে পারবেন, সেটিও তিনি নিয়ন্ত্রণ করতেন। সময়ের সঙ্গে পরিবারের অন্য আত্মীয়দের সঙ্গে যোগাযোগ কমে আসে। মিশেলও বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে দেন। তবে তার স্ত্রী মিশেল অভিযোগের পক্ষে সহযোগিতা না করায় মামলাটি আর এগোয়নি। প্রাথমিক শুনানিতে মিশেল তার আগের বক্তব্য পরিবর্তন করায় অভিযোগগুলো প্রত্যাহার করা হয়। পরিবারের সংকটের বিষয়টি আগে শনাক্ত করে কেউ হস্তক্ষেপ করতে পারতেন কি না, সেটিও তদন্তের অংশ হবে। ভবিষ্যতে যেন সংকটে থাকা পরিবারগুলো সহায়তার বাইরে থেকে না যায়, সে বিষয়েও কাজ করার কথা জানান তিনি। তাদের বাড়িতে আসার পরই হত্যাকাণ্ড ঘটে।
তদন্তে উঠে এসেছে যে, ২০১৯ সালে ৪০ ক্যালিবারের আগ্নেয়াস্ত্র দেখিয়ে ভয় দেখানোর অভিযোগে ম্যাথিউকে একবার গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। তবে মিশেল স্টোনের সহযোগিতার অভাবে সেই মামলাটি তখন আলোর মুখ দেখেনি। পুলিশ জানিয়েছে, ৯ অক্টোবরের ভয়াবহ ঘটনায় ব্যবহৃত অস্ত্রটিই সেই পুরোনো আগ্নেয়াস্ত্র। আইনগতভাবে তার কাছে অস্ত্র রাখার অনুমোদন থাকলেও, ঘটনার আগ পর্যন্ত পরিবারে কোনো সহিংসতার নতুন অভিযোগ প্রশাসনের কাছে ছিল না। এখন স্থানীয় প্রশাসন খতিয়ে দেখছে যে, এই সংকটাপন্ন পরিবারটিকে সহায়তার জন্য কোনো সংস্থা আগে ব্যবস্থা নিতে পারত কি না। পুলিশপ্রধান রিক লোরাহ জানান, ২০১৯ সালের ওই ঘটনায় ব্যবহৃত আগ্নেয়াস্ত্রটিই শুক্রবারের (৯ অক্টোবর) হত্যাকাণ্ডে ব্যবহার করা হয়েছে বলে তদন্তে জানা গেছে। সাম্প্রতিক সময়ে পারিবারিক সহিংসতার কোনো অভিযোগও তাদের কাছে জমা পড়েনি। মেয়র বলেন, পরিবারটি যে সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল, তা বোঝার কোনো সুযোগ ছিল কি না এবং সংশ্লিষ্ট ব্যবস্থাগুলো ভিন্নভাবে সাড়া দিতে পারত কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
তদন্তকারীরা জানতে পেরেছেন, অন্তঃসত্ত্বা অ্যাঞ্জেলিনার সন্তান জন্ম দেওয়ার সম্ভাব্য তারিখ ছিল ১৯ অক্টোবর। হাসপাতালে যাওয়ার সুবিধার্থে তিনি লোরা ও টুইলাকে বাড়িতে আসতে অনুরোধ করেছিলেন। পুলিশের ধারণা, অ্যাঞ্জেলিনা সেইদিন সন্তান জন্মের পর বাড়ি ছেড়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, কারণ তার রুমে ব্যাগভর্তি জিনিসপত্র পাওয়া গেছে। এছাড়া বাবার মানসিক অস্থিরতা ও সম্পর্কের জটিলতা থেকে মুক্তি পেতে তিনি নিজের পদবি পরিবর্তনের জন্য আদালতে আবেদনও করেছিলেন। হত্যাকাণ্ডের পর তার শোবার ঘরে তল্লাশি চালিয়ে তদন্তকারীরা ব্যাগ ও বাক্সে ভরা অনেক জিনিসপত্র পান। বাবার সঙ্গে সম্পর্ক থেকে নিজেকে আলাদা করতেও অ্যাঞ্জেলিনা নিজের পদবি পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিয়েছিলেন। ওই আবেদনের সঙ্গে দেওয়া হলফনামায় তিনি বাবার মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতির বিষয়ে উদ্বেগের কথা উল্লেখ করেন। পাশাপাশি চিকিৎসাক্ষেত্রে পেশা গড়ার ইচ্ছার কথা জানিয়ে বলেন, বাবার সঙ্গে সম্পর্কের কারণে তিনি নিজের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় কোনো প্রভাব পড়ুক, তা চান না।