রবিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:৪৭ পূর্বাহ্ন

রাশিয়ায় চাকরির প্রলোভনে মানবপাচার: ড্রোন হামলায় ঝরল ২০ প্রাণ

প্রতিবেদকের নাম

রাশিয়ায় উচ্চ বেতনে চাকরির লোভ দেখিয়ে নিয়ে গিয়ে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের সম্মুখসারিতে ঠেলে দেওয়া হয়েছে অন্তত ৩০ জন বাংলাদেশিকে। জাবাল-ই-নুর, হারেস ইন্টারন্যাশনাল ও টিএস গ্রুপ নামের তিনটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সংঘটিত এই মানবপাচারের ভয়াবহ তথ্য সামনে এনেছে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটিলিয়ন (এসআরবি)। এ ঘটনায় চক্রের মূলহোতাসহ দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পরবর্তী সময়ে তাদের রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য বাধ্য করা হয়।

বুধবার (১৪ অক্টোবর) রাজধানীর কারওয়ান বাজারে এসআরবি মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসআরবি-১০-এর অধিনায়ক অতিরিক্ত ডিআইজি মোহা. আসাদুজ্জামান জানান, পাচারের শিকার এই বাংলাদেশিদের প্রথমে রাশিয়ায় পাঠানো হয়। পরে তাদের জোরপূর্বক রুশ সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে বাধ্য করা হয়। প্রশিক্ষণের পরপরই তাদের যুদ্ধের ময়দানে পাঠানো হতো, যেখানে প্রতিপক্ষের অবস্থান শনাক্তকরণের জন্য এক ধরনের ‘শিকার’ হিসেবে ব্যবহার করা হতো তাদের।

তিনি আরও জানান, ড্রোন হামলা চালিয়ে প্রতিপক্ষের অবস্থান ও দূরত্ব বোঝার কৌশল হিসেবে এদের সামনের সারিতে রাখা হতো। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, এই চক্রের খপ্পরে পড়া প্রায় ২০ জন বাংলাদেশি ইতিমধ্যে নিহত হয়েছেন। বাকিদের মধ্যে দুজন আহত অবস্থায় স্থানীয় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন এবং ছয়জন এখনো যুদ্ধক্ষেত্রে রয়েছেন। এছাড়া দুজন কোনোক্রমে পালিয়ে দেশে ফিরে আসতে পেরেছেন। তাদের মধ্যে প্রায় ২০ জনই ইতিম‌ধ্যে মারা গে‌ছেন। এরপর তাদের ওপর প্রতিপক্ষ ড্রোন হামলা করলে হামলাকারীদের অবস্থান ও দূরত্ব শনাক্ত করা হতো। চার দিন কষ্ট করে হাসপাতালে পৌঁছে চিকিৎসা নেন রাজন। তাদের মধ্যে প্রায় ২০ বাংলাদেশি ইতিমধ্যে মৃত্যুবরণ করেছেন এবং ২ জন কোনোরকমে পালিয়ে দেশে ফেরত আসেন।

গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন মানবপাচার চক্রের মূলহোতা মিজানুর রহমান (৫৫) এবং মো. আবু তাহের লেন্টু (৫০)। এসআরবি জানায়, মঙ্গলবার গভীর রাতে ফরিদপুরের নগরকান্দার আটাইল এলাকা থেকে মিজানুরকে এবং ঝিনাইদহের কালিগঞ্জ থেকে তাহের লেন্টুকে গ্রেপ্তার করা হয়। মিজানুর জাবাল-ই-নুর ইন্টারন্যাশনাল এজেন্সির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

ভুক্তভোগী রাজন হোসেনের অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিয়ে এসআরবি কর্মকর্তা জানান, ৮ লাখ ২৫ হাজার টাকার বিনিময়ে তাকে কনস্ট্রাকশন কাজের কথা বলে পাঠানো হয়েছিল। ৭ মে রাশিয়ায় পৌঁছানোর পর তাকে সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে বাধ্য করা হয়। ২১ দিনের প্রশিক্ষণ শেষে যুদ্ধের ময়দানে পাঠানোর পর ড্রোন হামলায় রাজন গুরুতর আহত হন। কোমরের হাড় ভেঙে যাওয়া ও দুই পায়ের কার্যক্ষমতা হারানো রাজন ২৩ আগস্ট দূতাবাসের সহায়তায় দেশে ফেরেন।

তদন্তে জানা গেছে, মিজানুর রহমান ছাড়াও এই চক্রের সাথে মোস্তাফিজুর রহমান ও আলী নামের আরও দুজনের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে। ভুক্তভোগীরা রাশিয়ায় যাওয়ার পর পরিস্থিতির ভয়াবহতা বুঝতে পেরে বারবার মিজানকে উদ্ধারের অনুরোধ জানালেও, তিনি কোনো সহায়তার বদলে বরং তাদের পরিবারকে হুমকি ও গালমন্দ করেছেন।

এসআরবি কর্মকর্তা আরও উল্লেখ করেন, জাবাল-ই-নুরের মাধ্যমে ২১ জনকে রাশিয়ায় পাঠানো হয়েছে। পাশাপাশি হারেস ইন্টারন্যাশনাল ও টিএস গ্রুপের নামও পাচারকারী হিসেবে উঠে এসেছে। এই চক্রের সাথে রাশিয়ায় অবস্থানরত আরও দুজনের সংশ্লিষ্টতা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। বর্তমানে ভুক্তভোগীর বাবার করা মামলার ভিত্তিতে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। এ ঘটনায় ভুক্তভোগীর বাবা কালীগঞ্জ থানায় মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধ ও দমন আইনে মামলা করেন।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


আমাদের ফেসবুক পেইজ